ব্রাহ্মণ্য যুগের শিক্ষা ও তার লক্ষ্য আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর)।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে, বৈদিক পরবর্তী যুগে স্থিতিশীল সমাজে সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত ব্রাহ্মণদের নিয়ন্ত্রিত শিক্ষার যুগকে বলা হয় ব্রাহ্মণ্যশিক্ষার যুগ। এই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে নানা প্রশাসনিক নিয়মের বেড়াজাল না থাকলেও এখানে একটা সুনির্দিষ্ট নিয়ম ছিল। তাই এই শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল সুসংগঠিত এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যপথে গতিশীল। যেখানে একটা নিটল সামাজিক পরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে প্রাচীন হিন্দু জীবনপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হতো।আসলে-
ব্রাহ্মণ সমাজ শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিল বলেই শিক্ষাগ্ৰহণে মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।মোট কথা হলো-ব্রাহ্মণ্যযুগে জাগতিক ও পারমার্থিক সবদিক থেকেই বিদ্যার প্রয়োজন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তুলেছে। আর সেখানে ব্রাহ্মণ্যশিক্ষার লক্ষ্যগুলি হলো-
•আত্মার লক্ষ্যঃব্রাহ্মণ্য যুগের শিক্ষার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য ছিল - আত্মার বন্ধনমোচন। আর এই বন্ধনমোচন করে মানুষকে মুক্তি লাভ করতে হবে। সেখানে মোক্ষলাভের জন্য ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য,বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস নামক চারটি স্তম্ভ ছিল।
• পরাবিদ্যার অনুশীলনঃ পরাবিদ্যা মানুষকে ব্রহ্মবিদ্যা লাভে সমর্থ করে তোলে, তাই পরাবিদ্যার অনুশীলন ছাড়া মুক্তি লাভ অসম্ভব। অপরপক্ষে অপরাবিদ্যা মানুষকে মুক্তি দিতে পারে না,বরং সমস্ত বন্ধনে মানুষকে বেঁধে ফেলে। তাই পরাবিদ্যা লাভ ছিল ব্রাহ্মণ্য শিক্ষার লক্ষ্য।
• ধ্যান ও মননঃচিন্তন,মনন ও সত্যানুসন্ধানের পথে দিব্যদৃষ্টির সাহায্যে পরমসত্তার স্বরূপ উপলব্ধি করাই ছিল ব্রাহ্মণ্য শিক্ষার উদ্দেশ্য। সেখানে শুধু বেদ পাঠ নয়, বেদ পাঠের মাধ্যমে উপলব্ধ শক্তির প্রসার করাই ছিল শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য।
• দেহ ও মনের বিকাশঃ ব্রাহ্মণ্য শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেহ ও মনের সুষম বিকাশ।এই শিক্ষায় শ্রম ও যোগাসনের দ্বারা শিষ্যের দেহকে সবল ও সুস্থ রাখার প্রচেষ্টা করতেন শিক্ষকগণ।আর এখানে ঋষিরা বিশ্বাস করতেন যে,পরাবিদ্যা অর্জনের সহায়ক হলো সুস্থ দেহ ও সতেজ মন।
•পরমতম সত্তার উপলব্ধিঃ প্রত্যেকটি মানুষ যে এক পরম সত্তার অংশ, আর এই সত্যটি মানুষকে উপলব্ধি করতে হবে। এই পরম সত্তার সঙ্গে নিজেকে অভিন্ন করে তুলতে পারলে এই জড় জগতের দুঃখ,জরা, মৃত্যু থেকে নিষ্কৃতি অর্থাৎ মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
• বিদ্যার্থীকে সামাজিক মানুষ রূপে গঠনঃ অপরাবিদ্যা লোকিক বিদ্যা হলেও প্রাচীন ঋষিরা তাকেও অবহেলা করেননি। সমাজের ও দেশের প্রয়োজনে এই প্রার্থী প্রয়োজনকে অস্বীকার করা হয়নি।সবাই নিষ্ঠাবান ব্রহ্মচারী হয়ে সমাজ সংসার ভুলে যাক-এটা প্রাচীন ঋষিরাও চাননি। সমাজে সৎ নাগরিকের সংখ্যা বৃদ্ধি হোক এটা প্রায় সবাই চাইতেন।
• ব্যক্তিসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশঃ প্রত্যেকটি শিষ্যের ব্যক্তিসত্তা পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হোক, এটা প্রত্যেক আচার্যই চাইতেন।আর সেখানে চরিত্র গঠন, ব্রহ্মচর্য পালন, আত্মসংযম, মনন ও চিন্তার শক্তির বিকাশ সাধন ছিল ব্রাহ্মণ্য শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য।
• পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, আর্য ঋষিরা জাগতিক সুখকেই জীবনের পরম লক্ষ্য বলে মনে করেননি। সুখ ও দুঃখের অতীত এক উপলব্ধি সন্ধান তাঁরা করেছেন। তাঁরা জানতে চেয়েছেন নিজের স্বরূপকে। মানুষ স্বরূপত পূর্ণ। আর এই পূর্ণতা বা পূর্ণ জ্ঞান, পূর্ণশক্তি, পূর্ণ আনন্দ জীবাত্মায় নিহিত। শিক্ষার লক্ষ্য সেই পরিপূর্ণতার বিকাশ, পূর্ণ জ্ঞান, পূর্ণ শক্তি পূর্ণ আনন্দকে ফুটিয়ে তোলা।তাই প্রসঙ্গত বিবেকানন্দ বলেছেন-
"Education is the manifestation of the perfection already in man."অর্থাৎ পূর্ণতা লাভই হচ্ছে শিক্ষার পরম লক্ষ্য।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏
Comments
Post a Comment