নবান্ন নাটকটিতে 'রূপের মোহ'এবং 'অরূপের উপলব্ধি' কীভাবে দেখানো হয়েছে, তা আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার,বাংলা মেজর,DS10, Unit-3)
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বিজন ভট্টাচার্য রচিত 'নবান্ন' নাটকটি ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ মন্বন্তরকে কেন্দ্র করে রচিত। যেখানে এই নাটকে রূপের মোহ এবং অরূপের উপলব্ধি বিষয় দুটি গভীরভাবে জীবন বাস্তবতার নিরিখে প্রকাশিত হয়েছে।আর সেখানে আমরা দেখি-
•রূপের মোহ•
•গ্রামীণ জীবনের রূপ। নবান্ন নাটকের প্রথম দিকে আমরা দেখি যে- প্রধান সমাদ্দার এবং অন্যান্য চাষী পরিবারের জীবনে যে সরল, শান্ত ও স্বাভাবিক গ্রামীণ জীবনের রূপ ছিল।যা এখানে 'রূপের মোহ' হিসেবে ধরা হয়েছে। আর সেখানে ফসল ফলানো, আনন্দ-উৎসব এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে থাকার যে পরিচিত ছবি, সেটাই ছিল তাদের জীবনের একমাত্র আকাঙ্ক্ষিত 'রূপ'। তবে-
•শহরের আপাত-প্রাচুর্যের তাদের মোহ। আমরা জানি যে,মন্বন্তরের সময় যখন গ্রামে খাদ্য ও জীবনধারণের কোনো উপায় ছিল না, তখন প্রধান সমাদ্দার ও তার পরিবারের সদস্যরা কলকাতার আপাত প্রাচুর্য ও কর্মসংস্থানের টানে শহরে পাড়ি দেয় এবং ভিড় জমায়। তবে এখানে বলে রাখা ভালো যে,শহর তাদের কাছে ছিল এক মিথ্যা আশ্বাস বা মোহময় রূপ। যেখানে গেলে হয়তো খেয়ে পরে বেঁচে থাকা যাবে এমনটাই তারা ভেবেছিল। শুধু তাই নয়,শহরের বাবুরা তাদের দুর্দিনে সাহায্য করবে এবং পাশে থাকবে এমনটাই তারা আশা করছিল। কিন্তু-
•ব্যক্তিগত স্বার্থের মোহ তাদের জীবন বদলে দেয়। সমাজের এক শ্রেণীর মানুষ, যাদের মধ্যে কালোবাজারী কালীধন ধাড়া বা চোরাচালানকারী হারু দত্তের মতো চরিত্রগুলির কাছে অর্থ ও সম্পদের লোভই ছিল চরম 'রূপের মোহ'।আর এইসকল অমানুষ গুলি দুর্ভিক্ষের সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের অসহায়তাকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি পুরণ করে নিতে সক্ষম হয়।
• অরূপের উপলব্ধি •
•গ্ৰামের মানুষের শহরে মোহভঙ্গ।প্রধান সমাদ্দার, কুঞ্জ বা অন্যান্যরা যখন কলকাতায় পৌঁছায়, তখন তারা বুঝতে পারে যে, শহরের জীবন তাদের কাছে শুধুই মোহের আবরণ মাত্র।সেখানে নেই কোনো মানবিকতা,নেই তাদের জন্য কোনো একচিলত জায়গা। যখন শহরের ফুটপাতে না খেতে পেয়ে তাদের আত্মীয়-স্বজন মারা যায়, তখন তাদের এই মোহ ভেঙে যায়। তারা বুঝতে পারে, শহরের তথাকথিত 'রূপ' (প্রাচুর্য) তাদের জন্য শুধু হতাশা আর মৃত্যু নিয়ে এসেছে। এটাই তাদের অরূপের উপলব্ধি।আর সেখানে আমারা দেখতে পাই-
•মানবতার অরূপ। চরম দুর্দশা ও বিপর্যয়ের মধ্যে বুভুক্ষু মানুষগুলো জীবনের আসল সত্য উপলব্ধি করে।আর সেই উপলব্ধি থেকে তাদের মধ্যে দলবদ্ধ সংগ্রাম ও সংহতির মধ্যেই যে জীবনের প্রকৃত অর্থ নিহিত, এই বোধ তাদের মধ্যে জন্ম নেয়। কুঞ্জ ও রাধিকার মধ্যেকার গভীর ভালোবাসা, নিরঞ্জনের মতো চরিত্রের চোরাচালানকারীকে ধরিয়ে দেওয়ার সাহস এবং বিপন্ন প্রধান সমাদ্দারের মধ্যে আবার বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা – এই সবই হলো 'অরূপের' প্রকাশ, যা বস্তুত মানুষের ভেতরের নৈতিক শক্তি ও জীবনবোধকে বোঝায়। অতঃপর দেখি-
•নতুন চেতনার উপলব্ধি। নবান্ন নাটকের অন্তিম মুহূর্তে প্রধান সমাদ্দার ও অন্যরা যখন ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রামে ফিরে যায়, তখন তাদের হাতে থাকে নতুন ধানের বীজ। অতঃপর তারা বুঝতে পারে যে,অতীতকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকা বা মিথ্যা মোহে আচ্ছন্ন হওয়া নয়, বরং সবাই মিলে নতুন করে জীবন শুরু করার সংগ্রামই জীবনের আসল সত্য।আর-
এই উপলব্ধিই তাদের ধ্বংসের মধ্য দিয়েও আশার আলো দেখায়। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা, ভাঙা ঘরকে আবার গড়ে তোলার সংকল্প, এটাই হলো নাটকের শেষাংশে প্রকাশিত অরূপের সার্থক উপলব্ধি। 'নবান্ন' (নতুন ফসল) শুধু শস্যের নয়, বরং নতুন জীবন ও নতুন চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে।আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি -
'নবান্ন' নাটকে চরিত্রগুলি প্রথমে রূপের মোহ (গ্রামীণ জীবনের স্থিতাবস্থা, শহরের প্রাচুর্য) দ্বারা চালিত হলেও, মন্বন্তরের আঘাতে ও শহরে চরম লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে তারা সেই মোহ থেকে মুক্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত অরূপের উপলব্ধি (সংগ্রামের সংহতি, মানবিক মূল্যবোধ ও নতুন করে জীবন শুরুর অদম্য প্রাণশক্তি) লাভ করে। এটাই নাটকের মূল ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDORBON YOUTUBE CHANNEL 🙏
Comments
Post a Comment