বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন নাটকে দেখা যায়-"একদিকে খাদ্যের ছড়াছড়ি অপরদিকে খাদ্যের অভাবে মানুষের তীব্র হাহাকার"-আলোচনা করো।
বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন নাটকে দেখা যায়-"একদিকে খাদ্যের ছড়াছড়ি অপরদিকে খাদ্যের অভাবে মানুষের তীব্র হাহাকার"-আলোচনা করো(পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর DS10, Unit-4)
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,'নবান্ন' নাটকে বিজন ভট্টাচার্য ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর বা দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে বাংলার সমাজ জীবনের দুটি বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছেন। যেখানে একদিকে খাদ্যের ছড়াছড়ি বা প্রাচুর্য এবং অপরদিকে খাদ্যের জন্য মানুষের তীব্র হাহাকার।এরই পাশাপাশি সমভাবে চলছে ব্লাক মার্কেট।যার ফলে সৃষ্টি হয় দুর্ভিক্ষ।আর সেই প্রেক্ষাপটে আমরা দেখতে পাই -
১) দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতাঃ নবান্ন নাটকের মূল অংশ জুড়ে আছে খাদ্যহীন মানুষের এক করুণ চিত্র। বিশেষ করে প্রধান সমাদ্দার ও তার পরিবারের মতো গ্রামের অসংখ্য কৃষক পরিবার খাদ্যের অভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, ফসল তোলার পরেও কৃষকের ঘরে ধান নেই। আবার দুর্ভিক্ষের কারণে তাদের সামান্য সঞ্চয়ও শেষ হয়ে যায়। তাই খাদ্য ও ঋণ পরিশোধের চাপে প্রধান সমাদ্দার ও কুঞ্জের মতো কৃষকেরা দিশেহারা হয়ে পড়ে।আর সেখানে আমরা দেখি-
• জীবন ও পরিবার বাঁচানোর তাগিদে গ্রাম ছেড়ে হাজার হাজার মানুষ শহরের পথে ভিড় করে। খাদ্যের জন্য তারা আজ কলকাতার ফুটপাত, পার্ক এবং লঙ্গরখানায় আশ্রয় নেয়।নবান্ন নাটকে এই দৃশ্য অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও মর্মস্পর্শী। আবার-
• খাদ্যের অভাবে প্রধানের দুই পুত্র, নিরঞ্জনের শিশুসন্তান এবং কুঞ্জের শিশুপুত্র মারা যায়। পঞ্চাননী, বিনোদিনী, রাধিকা-র মতো নারী চরিত্রগুলির মুখে খাদ্যের জন্য তীব্র হাহাকার শোনা যায়।সামান্য ভাতের ফ্যান বা লঙ্গরখানার পচা খাবারও তাদের কাছে অমৃত হয়ে ওঠে। আর এখানে আমরা দেখতে পাই-
• খাদ্যের অভাবে মানুষ তার স্বাভাবিক মানবিকতা হারাতে বাধ্য হয়। আর সেকারণেই তারা চুরি, ভিক্ষা, দেহ বিক্রি-এমন জঘন্য পথেও অনেকে পা বাড়ায়। যার ফলে মানুষ আর পশুর মধ্যে আর কোন ভেদাভেদ না। কারণ মানুষ ও কুকুর একই সাথে একই উচ্ছিষ্ট খাবারের জন্য লড়াই করে। পাশাপাশি-
২) মুনাফাখোরদের খাদ্যের ছড়াছড়ি বা প্রাচুর্য
১৯৪৩ সালে গ্রামবাংলা খাদ্যের অভাবে জ্বলছে, ধুঁকছে মানুষগুলি।আর সেই সময়ে শহরে ও গ্রামে একদল মানুষ এই দুর্ভিক্ষকে পুঁজি করে চরম মুনাফা লুটতে থাকে। নবান্ন নাটকে এই প্রাচুর্যের ছবি পলকে পলকে ধরা পড়েছে। আর সেখানে আমরা দেখি-
• নবান্ন নাটকের বিভিন্ন সংলাপে জোতদার, মহাজন ও চোরাকারবারীদের কথা উঠে এসেছে। যেখানে তারা বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য গুদামজাত করে রাখে। পরবর্তীতে তারা চড়া দামে সেগুলি বিক্রি করে। তাই এই কালোবাজারের রমরমা এ নাটকের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই চোরাকারবারীরাই ছিল সেই সময় শহরের খাদ্য প্রাচুর্যের প্রধান উৎস। শুধু তাই নয় -
• শহরের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত সমাজে অভুক্ত মানুষের হাহাকার সম্পর্কে উচ্চবিত্ত মানুষগুলি সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল। তারা এ সময়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করত।আর খাদ্যের অভাবে একশ্রেণীর মানুষ ভিক্ষুকে পরিনত হয়। অতঃপর ঐ মানুষগুলি ফুটপাতে অনাহারে মৃত্যুবরণ করতে থাকে। অবশেষে -
নবান্ন নাটকের চতুর্থ অঙ্কে আমরা দেখি যে,কৃষকেরা গ্ৰামে ফিরে সম্মিলিত উদ্যোগে আবার ধান ফলায়। আবার 'নবান্ন' উৎসব করে । তবুও প্রশ্ন থেকে যায় যে, এই নতুন ধানের প্রাচুর্য শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে? আসলে 'নবান্ন' নাটকে এই প্রাচুর্য ও হাহাকারের চিত্র এই প্রাকৃতিক নয়, শ্রেণী বিভাজনের ফলশ্রুতি।
Comments
Post a Comment