Skip to main content

আত্মহত্যাকে নৈতিক অপরাধ বলা যেতে পারে কী? তোমার উত্তরের স্বপক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি দাও।

আত্মহত্যাকে নৈতিক অপরাধ বলা যেতে পারে কী? তোমার উত্তরের স্বপক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি দাও (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পঞ্চম সেমিস্টার, দর্শন মাইনর, তৃতীয় ইউনিট)।


     আমরা আলোচনার শুরুতেই বলে রাখি যে,আত্মহত্যাকে নৈতিক অপরাধ বলা যেতে পারে কিনা, এই প্রশ্নটি বেশ জটিল,বিতর্কিত। শুধু মাত্র তাই নয়,এর উত্তর বিভিন্ন দার্শনিক, ধর্মীয় ও আধুনিক মনস্তাত্ত্বিকগণ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন।আর সেখানে-

           • ঐতিহ্যগতভাবে অনেক ক্ষেত্রেই এটিকে নৈতিক অপরাধ (বা পাপ) বলা হয়। তবে আধুনিক সমাজে এটিকে প্রধানত মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্কট বা মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখা হয়েছে। যেখানে অপরাধের ধারণা বা বিষয়টি ক্রমশ গৌণ হয়ে আসছে।

   •আত্মহত্যাকে নৈতিক অপরাধ বলার পক্ষে যুক্তি•                                (ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিকোণ)

১)ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় যে,প্রায় সব প্রধান ধর্মেই (হিন্দু,ইসলাম, খ্রিস্টান) জীবনকে ঈশ্বরের দান বা পবিত্র সম্পত্তি হিসেবে দেখা হয়। তাই, স্বেচ্ছায় সেই জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটানোকে ঐশ্বরিক আইনের লঙ্ঘন বা গুরুতর পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়।

 ২)কর্তব্যের লঙ্ঘন এর দৃষ্টিকোণ থেকে দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের মতো কর্তব্যবাদীরা মনে করেন যে,প্রতিটি মানুষের নিজের প্রতি এবং মানবসত্তার মূল্য রক্ষার প্রতি একটি নৈতিক কর্তব্য আছে।স্ব-ইচ্ছায় আত্মহত্যা করা সেই মৌলিক মানবিক মূল্যকে অস্বীকার করে, যা নৈতিকভাবে চরম ভুল বলে গণ্য।

৩)সামাজিক দায়িত্বের দিক থেকে আত্মহত্যা কেবল ব্যক্তির নিজস্ব ক্ষতি নয়, এটি পরিবার, বন্ধু এবং সমাজের ওপর সুদূরপ্রসারী মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে থাকে। এর ফলে, ব্যক্তি তার সামাজিক দায়িত্ব ও সম্পর্কগুলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়।

           • নৈতিক অপরাধ না বলার পক্ষে যুক্তি•                                            (আধুনিক দৃষ্টিকোণ)

 ১)মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকে আধুনিক মনোবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, বেশিরভাগ আত্মহত্যার পেছনে গুরুতর মানসিক অসুস্থতা (ক্লিনিকাল ডিপ্রেশন, বাইপোলার ডিসঅর্ডার বা তীব্র মানসিক যন্ত্রণা) কাজ করে থাকে। আর  যখন কেউ এমন সঙ্কটে থাকে, তখন সে স্বাভাবিক, স্বাধীন ও যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

   ২) যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তের দিক থেকে অসুস্থতার ফলস্বরূপ নেওয়া কোনো কাজকে নৈতিকভাবে অপরাধ বলা যায় না। বরং বলা যেতে পারে এটিকে চিকিৎসাগত ও মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত।

৩)ব্যক্তির স্বাধিকার দিক থেকে উদারনৈতিক নৈতিকতা এবং ব্যক্তির স্বাধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।আর এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় যে,নিজের জীবনের ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ব্যক্তিরই থাকা উচিত। তবে, এটি সাধারণত কঠিন শারীরিক যন্ত্রণায় ভোগা রোগীদের (ইউথানেশিয়া বা ইচ্ছামৃত্যু) ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য।

 ৪) আইনের দৃষ্টিতে বিশ্বের অনেক দেশেই, যেমন ভারতে, আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকে আর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। এটি নির্দেশ করে যে, সমাজ এই বিষয়টিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধের চেয়ে প্রতিরোধযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখছে। তবে-

          আত্মহত্যাকে 'নৈতিক অপরাধ' বলা একটি সেকেলে ধারণা। যদিও এর ফলস্বরূপ সৃষ্টি হওয়া সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষতি অনস্বীকার্য।তবুও এই কাজটিকে ব্যক্তির নৈতিক ব্যর্থতা বা অপরাধ হিসেবে দেখার পরিবর্তে, একে গভীর মানসিক যন্ত্রণা ও মানবিক সঙ্কটের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা অধিক মানবিক ও বিজ্ঞানসম্মত। আসলে-

           • নৈতিক কর্তব্য হলো যে, ব্যক্তি এমন চরম সীমায় পৌঁছাচ্ছে, তাকে বিচার করা নয়, বরং সহানুভূতি, মানসিক সমর্থন ও চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে তাকে রক্ষা করা এবং সমাজে আত্মহত্যার কারণগুলি দূর করার জন্য কাজ করা।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...