Skip to main content

সীতার বনবাস' গ্ৰন্থটিতে তুলে ধরা হয়েছে নারীর প্রতি সমাজের অবিচার ও নির্মমতার এক মর্মন্তুদ ট্রাজেডি-আলোচনা করো ।

'সীতার বনবাস' গ্ৰন্থটিতে তুলে ধরা হয়েছে নারীর প্রতি সমাজের অবিচার ও নির্মমতার এক মর্মন্তুদ ট্রাজেডি-আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পঞ্চম সেমিস্টার, বাংলা মাইনর)।

         •আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের 'সীতার বনবাস' (১৮৬০) গ্রন্থটি কেবল ভবভূতির 'উত্তরচরিত' ও বাল্মীকির রামায়ণের উত্তরকাণ্ডের সঙ্কলন নয়।এটিতে তুলে ধরা হয়েছে নারীর প্রতি সমাজের অবিচার ও নির্মমতার এক মর্মন্তুদ ট্র্যাজেডি। আসলে বিদ্যাসাগর এই অনুবাদে সীতাকে পৌরাণিক দেবী রূপে নয়, বরং মানবী রূপে ফুটিয়ে তুলেছেন, যার জীবন লোকনিন্দা ও রাজধর্মের কাছে বলিদান হয়েছিল। আর সেই অনুবাদ গ্ৰন্থে আমরা দেখতে পাই-

           • সীতার ট্র্যাজেডির মূল দিকগুলি সুস্পষ্ট ও সাবলীল ভাষায় সীতার ট্র্যাজেডিকে তুলে ধরা হয়েছে। আর ট্রাজেডিকে চারটি স্তরে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।আর সেই ভাগ গুলি হলো-

১)লোকনিন্দা ও তৎকালীন সমাজের নির্মমতাঃ সীতার জীবনে ট্র্যাজেডির মূল কারণ হলো- নির্লজ্জ লোকনিন্দা। লঙ্কা থেকে ফিরে আসার পর অগ্নিপরীক্ষা দিয়েও সীতা যখন স্বামীর সাথে সুখে সংসার করছেন, তখনই সামান্য এক রজকের মুখনিঃসৃত জনরবের ভিত্তিতে রামচন্দ্র তাঁকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে-

         অগ্নিপরীক্ষার ব্যর্থতা: সীতাকে দ্বিতীয়বার বনবাসে পাঠানোর ঘটনা প্রমাণ করে যে,সমাজে নারীর সতীত্ব প্রমাণের জন্য কোনো পরীক্ষাই যথেষ্ট নয়।একবার অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরেও সমাজ তাঁকে কলঙ্কিনী হিসেবে চিহ্নিত করে।

       •নিরীহ নারীর লাঞ্ছনাঃগ্ৰন্থটিতে সীতাকে কোনো দোষে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি; শুধুমাত্র 'লোকে কি বলবে'—এই ভয়ের কাছেই তাঁকে বলি হতে হয়।যেটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাছে নারীর আত্মমর্যাদার চরম পরাজয়।

২)রামের কর্তব্যনিষ্ঠা বনাম ব্যক্তিগত প্রেমঃ আমারা জানি যে,রামচন্দ্র সীতার ট্র্যাজেডির কেন্দ্রবিন্দু। রামের চরিত্রে রাজধর্ম ও ব্যক্তিগত প্রেমের যে প্রবল দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে, যা সীতার জীবনকে মর্মান্তিক করে তুলেছে।আর সেখানে -

      •রাজার চরম সিদ্ধান্তঃ রামচন্দ্র একজন আদর্শ রাজা হিসেবে 'প্রজারঞ্জন'-কে ব্যক্তিগত সুখের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেন। তিনি অষ্টাবক্রের কাছে অঙ্গীকার করেন-যদি প্রজার মনোরঞ্জনের জন্য তাঁকে স্নেহ, দয়া বা 'প্রাণপ্রিয়া জানকীর মায়াপরিত্যাগ' করতে হয়, তাতেও তিনি কাতর হবেন না। যেখানে -

     •ব্যক্তিগত যন্ত্রণাঃ রামের এই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সহজ ছিল না। বনবাসের পর রামের বিলাপ ও মর্মযাতনা প্রমাণ করে যে ব্যক্তিগতভাবে তিনি সীতাকে ভালোবাসতেন। কিন্তু রাজপদের কাছে সেই ভালোবাসা তুচ্ছ হয়ে যায়। এই নির্মম কর্তব্যনিষ্ঠা সীতাকে অসহায় করে তোলে।

 ৩)সীতার একাকীত্ব ও অসহায়তাঃ সীতার বনবাসের সময়কাল ট্র্যাজেডিকে আরও গভীর করেছে। বনবাসের সময় সীতা ছিলেন গর্ভবতী (গর্ভ প্রায় পূর্ণ অবস্থায়)। রাম তাঁর স্ত্রীকে এমন সময় ত্যাগ করলেন, যখন তাঁর সবচেয়ে বেশি স্বামীর সাহচর্য প্রয়োজন ছিল। লক্ষ্মণ যখন তাঁকে বাল্মীকি আশ্রমে রেখে এলেন, তখন সীতার অসহায়তা পাঠককে গভীরভাবে স্পর্শ করে। আর সেখানে-

       •মাতৃত্বের মর্যাদা হানিঃ গর্ভবতী নারীকে ত্যাগ করা সমাজের চোখেও চরম অবিচার।এই পরিস্থিতিতে সীতাকে অবলম্বনহীন করে দেওয়ায় তাঁর ট্র্যাজেডি আরও করুণ হয়ে ওঠে।

৪)বিদ্যাসাগরের মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিঃ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর রচনাটিতে পৌরাণিক অলৌকিকতাকে প্রায় সম্পূর্ণ বর্জন করে সীতার ট্র্যাজেডিকে এক মানবিক মাত্রায় উন্নীত করেছেন।

      •নারীর প্রতি সহানুভূতিঃ এই গ্রন্থের মধ্য দিয়ে বিদ্যাসাগর তৎকালীন সমাজের বিধবাদের মতো অসহায় ও লাঞ্ছিত নারীদের প্রতি তাঁর গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। সীতার ট্র্যাজেডি যেন উনিশ শতকের ভারতীয় নারীর প্রতীকী রূপ।

     •করুণ রসের সার্থকতাঃ বিদ্যাসাগরের সরল, সুমধুর সাধুগদ্যে সীতার দুঃখ, মূর্ছা যাওয়া, লক্ষ্মণের আকুলতা এবং রামের মনোবেদনা এমনভাবে চিত্রিত হয়েছে যে তা পাঠককে করুণ রসে আপ্লুত করে তোলে।

          •• পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,'সীতার বনবাস' গ্রন্থটি নারীজীবনের এক শাশ্বত ট্র্যাজেডি, যেখানে আদর্শ রাজা রামের কর্তব্যবোধের হাতে এক পবিত্র ও নির্দোষ নারী বলি হয়েছেন। বিদ্যাসাগর এই পৌরাণিক আখ্যানকে মানবিক লাঞ্ছনা ও সামাজিক অবিচারের প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে সীতাকে চিরন্তন দুঃখিনী নারীর প্রতীকে পরিণত করেছেন। এই মর্মন্তুদ পরিণতির মধ্য দিয়েই গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

       •ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...