ডাকঘর নাটকের প্রধান চরিত্র অমল,"সে মুক্তিকামী আলোর প্রতীক"- আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ, দ্বাদশ শ্রেণি, বাংলা চতুর্থ সেমিস্টার)।
আমরা জানি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ডাকঘর' নাটকের কেন্দ্রীয় ও প্রধান চরিত্র হলো অমল। এই অমলকে নাটকের মূল ভাবনার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আর এই প্রেক্ষিতে ডাকঘর নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র অমলের চরিত্রটি আলোচনা করা যেতে পারে নিম্নোক্তভাবে-
১) অমল কল্পনাপ্রবণ ও সুদূরের প্রতি আকর্ষণঃ-
অমল একটি অসুস্থ, অনাথ বালক।কবিরাজের বারণ থাকায় সে গৃহবন্দী। কিন্তু তার মন ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে থাকতে চায় না।কারণ বাইরের পৃথিবীর প্রতিটি সামান্য জিনিসও তার কাছে এক অসীম আকর্ষণের বিষয়।তার শিশুমন কল্পনা ও জিজ্ঞাসায় ভরপুর।সে দইওয়ালা, প্রহরী বা পথিকের জীবনযাত্রায় মুক্তির আনন্দ খুঁজে পায়।আর তখন সে দইওয়ালাকে বলে-
"আমি যদি তোমার সঙ্গে চলে যেতে পারতুম তো যেতুম।... তুমি যে কত দূর থেকে হাঁকতে হাঁকতে চলে যাচ্ছ শুনে আমার মন কেমন করছে।"
পরক্ষণেই অমল প্রহরীকে জিজ্ঞাসা করে তার ঘণ্টার রহস্য।আর এখানে অমলকে বলতে শুনি-
"তোমার ঘণ্টা কেন বাজে? ঘণ্টা এই কথা সবাইকে বলে, সময় বসে নেই, সময় কেবলই চলে যাচ্ছে। কোথায় চলে যাচ্ছে? কোন্ দেশে? সে কথা কেউ জানে না।...আমার ভারি ইচ্ছে করছে ঐ সময়ের সঙ্গে চলে যাই,যে দেশের কথা কেউ জানে না সেই অনেক দূরে।"
২)মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় অমলঃ-
অমলের সমগ্র সত্তায় কাজ করে মুক্তির এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তার কাছে ঘর হলো এক বন্ধন বা অচলায়তন। এই বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে সে অচেনার পথে যাত্রা করতে চায়। আর রাজার ডাকঘর হলো তার কাছে সেই মুক্তির প্রতীক, যা সুদূরের সাথে যোগসূত্র স্থাপন করে।আসলে রাজার চিঠি মানে হলো অসীমের আহ্বান বা মৃত্যু। যা তাকে তার চির-আকাঙ্ক্ষিত মুক্তি দেবে। তাই সে বলে-
"বড়ো হলে আমি রাজার ডাক-হরকরা হব।... রোদ নেই বৃষ্টি নেই, গরিব নেই বড়োমানুষ নেই, সকলের ঘরে ঘরে চিঠি বিলি করে বেড়ানো-সে খুব জবর কাজ!"
আসলে রাজার ডাক-হরকরা হওয়ার বাসনা বস্তুতপক্ষে মৃত্যুর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী মুক্তির পথের পথিক হওয়ার প্রতীক।
৩)অমল বিশ্বপথিক। অমল শুধুমাত্র অসুস্থ বালক নয়, সে এক চিরন্তন মানবাত্মার প্রতীক।যে 'সীমা' থেকে 'অসীমের' দিকে যাত্রা করে। সে এই পৃথিবীতে ক্ষণিকের অতিথি। যার জন্য বিশ্বপ্রকৃতির সকল রহস্য উন্মোচিত। মাধব দত্ত (সংসারী মানুষ) তাকে পণ্ডিত বা প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি হিসেবে দেখতে চান। কিন্তু অমল সেই বাঁধাধরা জীবনে আগ্রহী নয়। তবে সেখানে-
৪)মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মুক্তিঃ শারীরিক অসুস্থতা তার গৃহবন্দী দশার কারণ হলেও, তা প্রতীকী অর্থে জাগতিক বন্ধনের প্রতীক। তাই নাটকের শেষে রাজার বৈদ্য (রাজকবিরাজ, যিনি মৃত্যুর প্রতীক) এসে তাকে মুক্তি দেন। অমলের মৃত্যু আসলে তার অনন্তলোকে যাত্রা বা পরম মুক্তি লাভ। অতঃপর রাজকবিরাজ অমলকে শান্তভাবে ঘুম(মৃত্যু)পাড়িয়ে দেন। আর তখন রাজ কবিরাজকে বলতে শুনি-
"এখন আকাশের তারাটি থেকে আলো আসুক, ওর ঘুম এসেছে।ও ঘুমিয়ে পড়েছে।"
পরিশেষে আমরা ভুলতে পারি যে,'ডাকঘর' নাটকে অমল চরিত্রটি একাধারে একটি শিশু, যে সুদূরের জন্য ব্যাকুল।আবার অন্যদিকে সে মানবাত্মার প্রতীক।তাই সে জাগতিক বন্ধন ছিন্ন করে অসীমের আনন্দলোকে মিলিত হতে চায়।তবে এখানে অমলের মৃত্যু কোন ট্র্যাজেডি নয়।বরং বলা যেতে পারে মৃত্যু তার কাছে চির-আকাঙ্ক্ষিত পরম মুক্তির বিষয়।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDORBON YOUTUBE CHANNEL 🙏
Comments
Post a Comment