বাংলা কাব্য ও কবিতায় ঈশ্বর গুপ্তের কৃতিত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়,পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মাইনর)
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯) বাংলা কাব্য ও কবিতার ইতিহাসে যুগ-সন্ধিক্ষণের একজন কবি হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। একদিকে তিনি ভারতচন্দ্রের মতো পুরোনো রীতির শেষ প্রতিনিধি ছিলেন, আবার অন্যদিকে তিনিই আধুনিক বাংলা কবিতার জন্মলগ্নকে সূচিত করেছিলেন।আর এই প্রেক্ষিতে তাঁর কাব্য কৃতিত্বে দেখি-
•লোক-জীবন ও সামাজিক চিত্রায়ণ।ঈশ্বর গুপ্তের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সমাজ-সচেতনতা এবং বাস্তবতা। তিনি তৎকালীন কলকাতার নাগরিক জীবন, সমাজের রীতিনীতি, ভণ্ডামি ও দুর্নীতিকে ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।আর সেখানে মূলত ব্যঙ্গাত্মক কবিতা ও স্যাটায়ারের মাধ্যমে সামাজিক অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন। রক্ষণশীল সমাজ ও ইংরেজ প্রভাবিত নব্য বাবু সমাজ-কেউই তাঁর সমালোচনার বাইরে ছিল না। সেই ব্যঙ্গ বিদ্রুপে তাঁর কাব্য কৃতিত্বে দেখি-
"ভাতৃভাব ভাবি মনে, / এক ঠাঁই থাকি,
যার যা আছে যতনে, / করি রক্ষা-আঁখি।
আসলে ঈশ্বর গুপ্তের কবিতায় পান্তাভাত, মাছ, ফুল, পাখী, এমনকি টিকটিকির মতো তুচ্ছ বিষয়ও স্থান পেয়েছে। এই কারণে তিনি ‘পাঁকাল মাছের কবি’ বা ‘লৌকিক কবি’ নামেও পরিচিত। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, তিনি ছিলেন প্রবলভাবে সমাজসচেতন কবি। তাই তাঁর কবিতায় আমরা পাই-
• স্বদেশপ্রীতি ও ঐতিহ্য সচেতনতা।ঈশ্বর গুপ্তের কবিতায় প্রবল স্বদেশপ্রীতি এবং হিন্দুধর্মীয় ঐতিহ্যপ্রীতি-র প্রকাশ আমরা দেখতে পাই।আর সেই কারণে তিনি তাঁর কবিতায় দেশের অতীত গৌরব এবং ধর্মের প্রতি গভীর অনুরাগ প্রকাশ করেছেন। শুধু তাই নয়, তার কবিতায় দেখতে পাই-
•মাতৃভাষা ও স্বদেশের জয়গান। ঈশ্বর গুপ্ত পরাধীন ভারতের কবি হলেও তিনি বাংলা ভাষা ও স্বদেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, অনুভূতি , অভিব্যক্তি অতি জোরের সাথে প্রকাশ করেছেন।আর সেই প্রকাশে তাঁর ‘মাতৃভাষা’ কবিতাটিতে আমরা পাই-
"মিছে আর কেন বল, / এবে যাই চল,
বিদেশের ভাষা আর, / শিখে কিবা ফল?
মাতৃভাষা-রূপ জল, / রাখ হৃদি-কোণে,
তবে সে সফল হবে, / জনম এখানে।"
• ঈশ্বর গুপ্ত প্রাচীন ও আধুনিকতার সেতুবন্ধনকারী। আসলে কবি ঈশ্বর গুপ্ত ছিলেন প্রাচীন রীতির শেষ কবি এবং আধুনিক রীতির প্রথম গুরু। সেখানে তাঁর রচনায় ভারতচন্দ্রের শ্লেষাত্মক শব্দ চয়ন এবং প্রাচীন মঙ্গলকাব্যের আখ্যানধর্মী ছন্দের প্রভাব ছিল।আর সেখানেই আমারা দেখতে পাই -
আগে ছুড়িগুলো ছিল ভালো, ব্রতধর্ম করতো সবে। একা বেথুন এসে শেষ করেছে, আর কি তাদের তেমন পাবে?
আধুনিকতার পূর্বাভাস। ঈশ্বর গুপ্ত সর্বপ্রথম কবিতায় সাধারণ মানুষের জীবন, রাজনীতি ও সমাজকে বিষয়বস্তু করে আধুনিক বাস্তবতার ভিত্তি স্থাপন করেন, যা পরবর্তীকালে মধুসূদন, বিহারীলাল ও রবীন্দ্রনাথের কাব্যে পূর্ণতা লাভ করে।এরই পাশাপাশি সমভাবে তিনি-
•সাংবাদিকতা ও সাহিত্য-সংরক্ষণে ঈশ্বর গুপ্তের অবদান অনস্বীকার্য।যেখানে তিনি তাঁর সম্পাদিত ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার মাধ্যমে বহু পুরোনো কবির বিশেষ করে রামপ্রসাদ সেন, ভারতচন্দ্র রায়ের লুপ্তপ্রায় জীবনী ও রচনা সংগ্রহ করে প্রকাশ করেন।আরএটি ছিল বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিক গবেষণার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,ঈশ্বর গুপ্তের কবিতা অনেক সময়ই দুর্বল ছন্দ বা অমার্জিত শব্দের কারণে আমরা ভারাক্রান্ত হতে পারি, কিন্তু তিনি বাস্তবকে কাব্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন।আবার স্বদেশপ্রেমের জাগরণ এবং আধুনিক কাব্যধারার পথ প্রশস্তকরণের আলোর দিশাও দেখালেন। তাই তিনি প্রথম বাঙালি কবি, যিনি ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবে তৎকালীন লোকজীবন, সামাজিক ত্রুটি এবং রাজনীতিকে কবিতার মূল বিষয় হিসেবে বেছে নিলেন। তাই সামাজিক বাস্তবতার প্রতিষ্ঠা, স্বদেশপ্রেমের স্ফুলিঙ্গ এবং আধুনিক কাব্যধারার ভিত্তি রচনা-র জন্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏
Comments
Post a Comment