Skip to main content

বাংলা সাহিত্যে ও সমাজ সংস্কারে দিগদর্শন থেকে বঙ্গদর্শন পর্যন্ত সাময়িক পত্রের ভূমিকা আলোচনা করো।

বাংলা সাহিত্যে ও সমাজ সংস্কারে দিগদর্শন থেকে বঙ্গদর্শন পর্যন্ত সাময়িক পত্রের ভূমিকা আলোচনা করো পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় তৃতীয় সেমিস্টার বাংলা মেজর।

         আমরা জানি যে,সাহিত্য ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে 'দিগদর্শন' থেকে 'বঙ্গদর্শন' পর্যন্ত সাময়িক পত্রগুলির ভূমিকা ছিল যুগান্তকারী।শুধু তাই নয়,এই সময়কালে অর্থাৎ ১৮১৮ থেকে ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত সাময়িক পত্রগুলি শুধুমাত্র তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম ছিল না, বরং বলা যেতে পারে যে, আধুনিক বাংলা গদ্য, সাহিত্য, ও জাতীয় চেতনার ভিত্তি তৈরি করেছিল।আর সেখানে আমরা দেখি- 

        প্রাথমিক পর্যায় অর্থাৎ পথপ্রদর্শক যুগে (১৮১৮ - ১৮৪০) সাময়িক পত্রগুলি বাংলা গদ্যকে পাঠকের কাছে পৌঁছানোর পথ তৈরি করে।যার ফলে বাংলা গদ্য আপামর জনসাধারণের হৃদয় জুড়ে নিজের জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে-

         •দিগদর্শন (১৮১৮) পত্রিকা। যে পত্রিকাটি ছিল বাংলা ভাষার প্রথম মাসিক সাময়িক পত্র। আর এই পত্রিকাটি শ্রীরামপুরের মিশনারিদের উদ্যোগে প্রকাশিত হয়।যার মূল লক্ষ্য ছিল স্কুল-পাঠ্য জ্ঞান (ভূগোল, ইতিহাস, বিজ্ঞান) প্রচার করা।বলা যেতে পারে যে, এই দিগদর্শন পত্রিকার মাধ্যমেই বাংলা ভাষায় সাময়িক পত্রের ধারা সূচিত হয়। অতঃপর-

       •সমাচার দর্পণ (১৮১৮) পত্রিকা।যে পত্রিকাটি ছিল প্রথম বাংলা সংবাদপত্র।বাংলা সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে মুদ্রণ মাধ্যমকে জনপ্রিয় করে তোলে। অতঃপর-

        •সংবাদ প্রভাকর (১৮৩১)। সংবাদ প্রভাকর পত্রিকাটি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত-এর সম্পাদনায় এটি প্রথমে সাপ্তাহিক ও পরে দৈনিক রূপে প্রকাশিত হয়।আর এটিই প্রথম সাময়িক পত্র যা সম্পূর্ণরূপে বাঙালি সম্পাদকের অধীনে ছিল।যে পত্রিকাটি বাংলা সাংবাদিক গদ্যের ভিত্তি স্থাপন করে। শুধু তাই নয় এখানে উল্লেখযোগ্যভাবে অনেক নতুন লেখকের আবির্ভাব ঘটে। অতঃপর আমরা দেখি- 

        • মধ্য পর্যায় অর্থাৎ  সামাজিক ও সাহিত্যিক ভিত্তি স্থাপনের কাল (১৮৪০ - ১৮৭০)।এই যুগে সাময়িক পত্রগুলি কেবল তথ্য পরিবেশন নয়, বরং আমরা বলতে পারি যে,সুচিন্তিত সমাজ সংস্কার ও গদ্যের মান উন্নয়নে মনোনিবেশ করে। আর সেখানে- 

       •তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা (১৮৪৩)। অক্ষয়কুমার দত্ত-এর সম্পাদনায় সেই সময়ে এটি ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র হিসাবে কাজ করত।এই পত্রিকাটিই প্রথম বাংলা গদ্যকে যুক্তিনিষ্ঠ, পরিশীলিত এবং বিশুদ্ধ সাহিত্যিক রূপ প্রদান করে।সমাজ সংস্কার, বিজ্ঞান এবং দর্শনের আলোচনাকে এটি উচ্চস্তরে নিয়ে যায়।এরই পাশাপাশি-

      •বিবিধার্থ সংগ্রহ পত্রিকা (১৮৫১)।এই বিবিধার্থ প্রত্রিকাটি ছিল প্রথম সচিত্র মাসিক পত্রিকা।আর রাজেন্দ্রলাল মিত্র সম্পাদিত এই পত্রিকাটি ইতিহাস, ভূগোল, শিল্পকলা ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করে পাঠকের জ্ঞানচর্চার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলেন।

      •শেষ অর্থাৎ পরিণত পর্যায়। এই পর্যায়ে সাহিত্য ও জাতীয় চেতনার উন্মেষ (১৮৭২) ঘটে। আসলে এই শেষ পর্যায়ে এসে সাময়িক পত্র তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য (শিক্ষা ও সংবাদ) থেকে সরে এসে বিশুদ্ধ সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে আত্মসচেতন করার দায়িত্ব নেয়।আর সেই আত্মসচেতনতার পর আত্মপ্রকাশ করে-

    • বঙ্গদর্শন (১৮৭২) পত্রিকা। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই বঙ্গদর্শন পত্রিকাটি এই ধারার চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে।আবার এই পত্রিকাটি সাহিত্যে উচ্চ মান লাভ করে। আসলে এই বঙ্গদর্শন পত্রিকাটি বাংলা গদ্যকে শিল্পসম্মত উচ্চতায় নিয়ে যায়।আর সেখানে বঙ্কিমচন্দ্রের বিখ্যাত উপন্যাসগুলি বিশেষ করে 'বিষবৃক্ষ' উপন্যাসটি এই বঙ্গদর্শন পত্রিকাতেই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। যার ফলে-

        • ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন ও সংস্কৃত বিষয়ক উচ্চমানের প্রবন্ধের মাধ্যমে এটি বাঙালি জাতীয়তা ও স্বাদেশিকতার ধারণা নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেখানে এই পত্রিকাটি শুধুমাত্র প্রবন্ধ বা উপন্যাসের ক্ষেত্র ছিল না, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ পরবর্তী প্রজন্মের অনেক লেখক বঙ্গদর্শনের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। শুধু তাই নয়-

       'দিগদর্শন' থেকে 'বঙ্গদর্শন' পর্যন্ত সাময়িক পত্রগুলির ধারাবাহিকতায় বাংলা সাহিত্য ও সমাজে রূপান্তরগুলি ঘটে।আর সেখানে  দিগদর্শন, সমাচার দর্পণ শিক্ষাবিস্তার, সংবাদ পরিবেশন, মুদ্রণ মাধ্যমের প্রতিষ্ঠা হয়। আর সংবাদ প্রভাকর, তত্ত্ববোধিনী সমাজ সংস্কারের প্ল্যাটফর্ম, যুক্তিনিষ্ঠ গদ্যের প্রতিষ্ঠা, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মিশ্রণ। তবে বঙ্গদর্শন গদ্যের শৈল্পিক রূপদান, উপন্যাস ও প্রবন্ধের বিকাশ, জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটাতে বিশেষ সহায়ক হয়ে ওঠে।

         ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 ‌

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...