Skip to main content

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রার্থনা কবিতার মূলভাব বস্তু বা বিষয় আলোচনা করো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রার্থনা কবিতার মূলভাব বস্তু বা বিষয় আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা)।

         আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'প্রার্থনা' কবিতাটি গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। এই কবিতাটির মূলভাব হলো কবির ব্যক্তিগত মুক্তি বা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কামনার পরিবর্তে দেশ ও মানব সমাজের বৃহত্তর কল্যাণ, নির্ভীকতা এবং কর্মের শক্তি প্রার্থনা করা।আর সেখানে আমরা দেখি- 

        •মিথ্যা বা তুচ্ছ আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্তির উপায়।কবি তাঁর প্রার্থনায় প্রথমেই ব্যক্তিগত সুখ-ভোগ বা ঐশ্বর্য লাভের মতো তুচ্ছ কামনা থেকে মুক্তি চেয়েছেন। তাঁর প্রার্থনা যেন তিনি জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে পারেন। তাই আমরা কবির কন্ঠে শুনতে পাই -

 "বিপদ হতে মোরে রক্ষা করো– এ নহে মোর প্রার্থনা,

            বিপদে আমি যেন না করি ভয়।"

আসলে এখানে কবি বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রার্থনা না করে বরং বিপদের মোকাবিলা করার মতো অভ্যন্তরীণ শক্তি ও নির্ভীকতা প্রার্থনা করছেন।আর সেই প্রার্থনায় কবি পান এক অপরিমেয়-

        •দুর্বলতা ও সন্দেহের ঊর্ধ্বে কর্মের শক্তি।আর সেখানে কবির প্রার্থনা নিষ্ক্রিয়তা নয়, বরং সক্রিয় কর্মের শক্তি লাভ করেন। অতঃপর তিনি কামনা করেন যে, জীবনের দুর্বলতা, সন্দেহ এবং আত্ম-অবমাননার অনুভূতি যেন তাঁকে আচ্ছন্ন না করে। তাই তিনি এই কঠিনতম দায়িত্বভার বহন করার শক্তি চান।আর সেই চাওয়ার মধ্যে আছে-

     "দুঃখ-তাপে ব্যথিত চিত্তে নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,

          দুঃখে যেন করিতে পারি জয়।"

তবে এখানে কবি বাইরের কোনো সাহায্যের অপেক্ষায় না থেকে, নিজের প্রতি বিশ্বাস রেখে কঠিন পরিস্থিতিতেও যেন নিজেকে সৎ রাখতে পারেন-এই তাঁর মূল কামনা বিষয়।আর সেই কামনা নিয়ে কবি-

       •সর্বংসহা শক্তির প্রার্থনা করেন।আর এখানে কবি চান তাঁর মধ্যে এমন এক মানসিক ক্ষমতা আসুক, যা জীবনের সমস্ত কঠিন আঘাত ও ক্ষতিকে সহজে মেনে নিতে পারেন।তবে এটি কেবল সহ্য করা নয়, বরং বলা যেতে পারে যে,ক্ষতির মধ্যেও সত্যকে ধরে রাখার শক্তি তিনি পান। তাই তিনি কামনা করেন-

   "যদি বা আমার সকলি হারায়, তবু যেন মনে করি

          হারানো আমার নহে তো ক্ষতি।"

      আসলে কবি জাগতিক ক্ষতিকে তুচ্ছ গণ্য করে, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সম্পদ রক্ষার দিকে জোর দিয়েছেন।আর সেই কামনা রক্ষার্থে কবি-

        •বৃহত্তর মানবতা ও কল্যাণ কামনা করেন।আর সে কল্যাণ কামনায় কবির এই প্রার্থনা। আর সেই প্রার্থনা কেবল কবির নিজের জন্য নয়, বরং বৃহত্তর মানব সমাজের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার শক্তি লাভের জন্য প্রার্থনা।সেই প্রার্থনার মধ্যে রবীন্দ্র-দর্শনের মানবতাবাদী দিকটির প্রতিফলন হয়েছে কবিতায়।যে মানবতার নিরিখে কবি কন্ঠে শুনি-

           "আমার সকল দুর্বলতা দূর করো,                      তোমার কর্মে আমার জীবনকে উৎসর্গ করিবার শক্তি।" 

          পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, প্রার্থনা কবিতার শেষ অংশের মাধ্যমে কবি প্রার্থনা করেন, যেন তিনি তাঁর জীবনকে কেবল নিজের জন্য না বাঁচিয়ে, ঈশ্বরের সেবার মাধ্যমে মানব কল্যাণে নিবেদিত করতে পারেন এবং তাঁর এই সংগ্রাম যেন সাফল্যের সাথে জয়যুক্ত হয়। তাই তিনি  'দুর্বলতা হতে মুক্তি ও কর্মের মাধ্যমে শক্তি লাভ' চান। আর এই চাওয়ার বিষয়টি হলো- উচ্চতর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রার্থনা, যেখানে কবি ব্যক্তিগত মুক্তি বা আরামের চেয়ে নির্ভীক, সত্যনিষ্ঠ এবং সেবামূলক জীবন যাপনের শক্তি প্রার্থনা করেছেন।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...