বাংলা সাধারণ রঙ্গালয়ের ইতিহাসে ন্যাশনাল থিয়েটারের গুরুত্ব ও অবদান আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়,পঞ্চম সেমিস্টার,বাংলা মেজর)।
আমরা জানি যে,বাংলা সাধারণ রঙ্গালয়ের ইতিহাসে ন্যাশনাল থিয়েটার (১৮৭২)-এর প্রতিষ্ঠা শুধুমাত্র একটি নাট্যদলের জন্ম নয়, বরং বলা যেতে পারে যে,এটি ছিল বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক অধ্যায়।ধনী বাবুদের বাগানবাড়ি থেকে থিয়েটারকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এর অবদান অপরিসীম।আর সেদিন-
ন্যাশনাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তারা ছিলেন বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটার গোষ্ঠীর সদস্যরা বিশেষ করে নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি, রাধামধব কর প্রমুখ।তবে-সাধারণ রঙ্গালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর ১৮৭২ সালের আগে কলকাতায় নাট্যচর্চা ছিল মূলত বিত্তবান ও অভিজাত শ্রেণির বিনোদনের মাধ্যম যেমন-বেলগাছিয়া বা পাথুরিয়াঘাটা থিয়েটার। কিন্তু সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না।আর সেকারণেই
ন্যাশনাল থিয়েটারই প্রথম নাটককে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। এটিই ছিল বাংলার প্রথম 'পাবলিক থিয়েটার' বা সর্বসাধারণের রঙ্গালয়। তবে এর আগে নাটক দেখার জন্য কোনো অর্থের প্রয়োজন হতো না, তা ছিল কেবল আমন্ত্রিতদের জন্য। কিন্তু ন্যাশনাল থিয়েটার নাটককে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেয় এবং টিকিট প্রথার প্রবর্তন হয়। যেখানে-
১৮৭২ সালের ৭ই ডিসেম্বর 'নীলদর্পন' নাটকের অভিনয়ে প্রথম টিকিট বিক্রি করে দর্শক প্রবেশের নিয়ম চালু হয়। টিকিটের দাম ছিল ১ টাকা ও ৫০ পয়সা।এটিই বাংলা থিয়েটারে পেশাদারিত্বের যুগের সূচনা করে। অতঃপর-
জাতীয়তাবোধ ও সমাজ সচেতনতায় এই নাট্যশালা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।আর সেই ভূমিকায় থিয়েটারটির নামকরণ 'ন্যাশনাল' বা 'জাতীয়' রাখার পেছনে গভীর দেশাত্মবোধ কাজ করেছিল।আর সেই দেশাত্মবোধে এই রঙ্গালয়ে প্রথম অভিনীত নাটক ছিল দীনবন্ধু মিত্রের ব্রিটিশ-বিরোধী নাটক 'নীলদর্পণ'। নিছক বিনোদনের বদলে থিয়েটারকে তারা প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এটি তৎকালীন যুবসমাজে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে। যেখানে-
তৎকালীন সময়ে শ্রেণিভেদ দূরীকরণে ধনী-দরিদ্রের যে বিশাল ব্যবধান ছিল, ন্যাশনাল থিয়েটার তা কিছুটা হলেও ভাঙতে পেরেছিল।আর সেখানে আমরা দেখি যে,টিকিট কাটার সামর্থ্য যার আছে, সেই নাটক দেখতে পারবে— এই নিয়মের ফলে দর্শকাসনে ধনী ও মধ্যবিত্তের সহাবস্থান তৈরি হয়। থিয়েটার আর নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির কুক্ষিগত রইল না। শুধু তাই নয়-
সেই সময় থেকে ভ্রাম্যমাণ থিয়েটারের সূচনা হয়। অর্থাৎ ন্যাশনাল থিয়েটার কেবল এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা কলকাতার বাইরে মফস্বল ও জেলা শহরেও নাটক প্রদর্শন করতে শুরু করে।যারফলে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে আধুনিক নাট্যকলা ছড়িয়ে পড়ে এবং যাত্রাগানের পাশাপাশি থিয়েটারও গ্রাম-বাংলার মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যার ফলে-
বাংলার নট ও নাট্যকারের সংযোগ সাধিত হয়।আর এই কারণেই ন্যাশনাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠার ফলে বহু প্রতিভাবান অভিনেতা ও নাট্যকার তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পান। যার মধ্যে নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি, অমৃতলাল বসু এবং পরবর্তীতে নটগুরু গিরিশচন্দ্র ঘোষের মতো ব্যক্তিত্বরা এই মঞ্চের মাধ্যমেই বাংলা থিয়েটারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তবে গিরিশচন্দ্র প্রথমে এর বিরোধিতা করলেও পরে এর গুরুত্ব বুঝে ন্যাশনাল থিয়েটারে যোগ দেন।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,ন্যাশনাল থিয়েটারের স্থায়িত্বকাল খুব বেশিদিন না হলেও এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।এটি ভেঙে পড়ার পরেই 'গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার', 'স্টার থিয়েটার' বা 'মিনার্ভা থিয়েটার'-এর মতো পেশাদার মঞ্চগুলো গড়ে ওঠে। যা বাংলা নাটকের বাণিজ্যিকীকরণ ও গণমুখী হয়ে ওঠার কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে ন্যাশনাল থিয়েটারের প্রাপ্য।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏
Comments
Post a Comment