"বাংলা গীতিকবিতার ভোরের পাখি বিহারীলাল চক্রবর্তী"—উক্তিটির যথার্থতা বিচার করে বাংলা কাব্যে তাঁর অবদান আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়,কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়,পঞ্চম সেমিস্টার,বাংলা মেজর/মাইনর)
ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা কাব্যের ইতিহাসে বিহারীলাল চক্রবর্তী (১৮৩৫–১৮৯৪) এক যুগসন্ধিক্ষণের কবি।মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি এক স্বতন্ত্র সুর নিয়ে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে আবির্ভূত হয়েছিলেন।আর সেখানে -
বাংলা কবিতায় যখন আখ্যানকাব্য ও মহাকাব্যের দোর্দণ্ড প্রতাপ, ঠিক সেই সময় বিহারীলাল কবিতাকে বাইরের জগৎ থেকে ফিরিয়ে এনে কবির অন্তর্জগতে স্থাপন করেন। তাঁর এই একক ও অনন্য সাধনার জন্যই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে 'বাংলা গীতিকবিতার ভোরের পাখি' বলে অভিহিত করেছেন।আসলে-
বিহারীলাল চক্রবর্তী আঁধার ও আলোর সন্ধিক্ষণের কবি।ভোরবেলা যেমন অন্ধকার পুরোপুরি কাটে না, আবার সূর্যও পুরোপুরি ওঠে না, ঠিক তেমনই বাংলা সাহিত্যের এক ক্রান্তিলগ্নে বিহারীলাল এসেছিলেন। তখন পুরনো রীতিনীতি অর্থাৎ ঈশ্বরগুপ্তের যুগ শেষ হচ্ছে, কিন্তু রবীন্দ্র-যুগের পূর্ণ সূর্যোদয় হয়নি।আর ঠিক তখনই-
বিহারীলাল চক্রবর্তী বাংলা সাহিত্যে একক কণ্ঠস্বর। ভোরবেলায় যেমন একটি-দুটি পাখি প্রথম ডেকে ওঠে এবং বাকিদের ঘুম ভাঙায়, বিহারীলালও তেমনি বাংলা কবিতায় প্রথম গীতিকবিতার (Lyric) সুর শুনিয়েছিলেন। তাঁর দেখানো পথেই পরবর্তীতে বাংলা গীতিকবিতা পূর্ণতা পায়। আর সেখানে
•বাংলা কাব্যে বিহারীলাল চক্রবর্তীর অবদান•
আমরা জানি যে,বিহারীলালের আগে বাংলা কবিতা ছিল মূলত 'বস্তুনিষ্ঠ'। অর্থাৎ, কবিরা লিখতেন রাজা-রানি, দেবতা বা বাইরের সমাজের কথা।আর সেই যুগে দাঁড়িয়ে বিহারীলালই প্রথম বললেন নিজের মনের কথা, সুখ-দুঃখ, হাহাকার ও দীর্ঘশ্বাসের কথা-
"সর্বদাই হু হু করে মন, বিশ্ব যেন মরুর মতন।"
তখন বোঝা যায়, বাংলা কবিতায় 'ব্যক্তি আমি'-র প্রবেশ ঘটেছে। এটিই গীতিকবিতার প্রাণ। আবার-
ইংরেজি রোমান্টিক কবিদের ন্যায় বিশেষ করে শেলি, কিটস মতো বিহারীলালের কবিতায় এক ধরণের বিষণ্ণতা ও অতৃপ্তি দেখা যায়।তিনি সৌন্দর্যের পূজারী, কিন্তু সেই সৌন্দর্যকে পুরোপুরি না পাওয়ার বেদনায় তিনি কাতর। তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্য 'সারদামঙ্গল' এই রোমান্টিক বেদনারই ফসল। তবে-
প্রাচীন বাংলা কাব্যে প্রকৃতি ছিল কেবল পটভূমি। কিন্তু বিহারীলালের কাছে প্রকৃতি হলো কবির সখা ও সান্ত্বনাদাত্রী। তিনি প্রকৃতির মধ্যে প্রাণের স্পন্দন অনুভব করেছেন। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি এবং মানবহৃদয় একসূত্রে গাঁথা। তবে-
মধ্যযুগের কাব্যে নারীকে দেখা হতো হয় দেবী হিসেবে, নয়তো কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে।বিহারীলাল তাঁর 'বঙ্গসুন্দরী' কাব্যে নারীকে রক্ত-মাংসের মানবী হিসেবে দেখলেন। তিনি ঘরের সাধারণ মেয়ে, জননী, জায়া ও ভগ্নীর মধ্যে দেবীত্বের সন্ধান করলেন। এটি ছিল বাংলা কাব্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। যে পরিবর্তনে-
মধুসূদনের মতো কঠিন শব্দ বা অলংকারের আড়ম্বর তাঁর ছিল না, ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা। আসলে তাঁর কবিতা ছিল ঝর্ণার মতো সাবলীল এবং আবেগের তোড়ে উৎসারিত।রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, বিহারীলালের কবিতা হলো- "অন্তরের জিনিস, তাই তাহার ভাষা ও ছন্দও অন্তরের।"
বিহারীলালের সবচেয়ে বড় অবদান হলো রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতিভার নির্মাণে তাঁর ভূমিকা। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে 'কাব্যগুরু' মানতেন। রবীন্দ্রনাথের শৈশবে ও কৈশোরে 'সারদামঙ্গল' ও 'বঙ্গসুন্দরী' গভীর প্রভাব ফেলেছিল। রবীন্দ্রনাথের 'সন্ধ্যাসঙ্গীত' কাব্যে বিহারীলালের স্পষ্ট ছায়া লক্ষ্য করা যায়। তাই বলা যায়, বিহারীলাল যদি জমি তৈরি না করতেন, তবে রবীন্দ্র-প্রতিভার বিকাশ হয়তো অন্যরকম হতো। তবে-
তাঁর ভাষা সবসময় সুগঠিত ছিল না, ছন্দেও মাঝে মাঝে পতন দেখা যেত। তিনি আবেগের বশে অনেক সময় কবিতাকে অসংযত করে ফেলতেন। কিন্তু একজন পথিকৃৎ হিসেবে এই ত্রুটিগুলো ক্ষমার যোগ্য।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,বিহারীলাল চক্রবর্তী ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক যুগ-প্রবর্তক কবি। আসলে তিনি বাংলা কবিতাকে বাইরের জগত থেকে মনের জগতে নিয়ে এসেছিলেন। মাইকেল মধুসূদনের মহাকাব্যিক গাম্ভীর্য এবং পরবর্তীকালের রবীন্দ্র-যুগের সূক্ষ্ম নান্দনিকতার মাঝখানে তিনি ছিলেন এক সার্থক সেতু। তবে তাঁর কাব্যে ভাষার কিছু জড়তা থাকলেও, আবেগের সততায় তিনি ছিলেন অনন্য। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে গীতি-কবিতার বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন, তার পথটি বিহারীলালই প্রস্তুত করে গিয়েছিলেন। তাই বাংলা গীতিকবিতার জনক হিসেবে এবং 'ভোরের পাখি' হিসেবে তাঁর স্থান বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏
Comments
Post a Comment