Skip to main content

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'কমলাকান্তের দপ্তর' গ্রন্থের অন্তর্গত 'বিড়াল' প্রবন্ধটি আলোচনা করো।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'কমলাকান্তের দপ্তর' গ্রন্থের অন্তর্গত 'বিড়াল' প্রবন্ধটি আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর)।

           আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,'বিড়াল' প্রবন্ধটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত রম্যরচনা সংকলন 'কমলাকান্তের দপ্তর' (১৮৭৫) গ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ।আর সেই প্রবন্ধে আফিং-খোর ব্রাহ্মণ কমলাকান্তের জবানিতে অত্যন্ত হালকা ও কৌতুকপূর্ণ ভঙ্গিতে বিড়াল প্রবন্ধটি রচিত হলেও এর গভীরে রয়েছে তীক্ষ্ণ সমাজ-সমালোচনা এবং দর্শনমূলক বক্তব্য।আর সেই বক্তব্যে আমরা দেখি-

        আলোচ্য 'বিড়াল'প্রবন্ধে কমলাকান্তের সঙ্গে একটি বিড়ালের কথোপকথন (আসলে কমলাকান্তের আফিংজনিত কল্পনা) বর্ণিত হয়েছে।যখন কমলাকান্ত গভীর রাতে দুধ পান করার পর আফিং সেবনে বিভোর, আর তখন একটি বিড়াল এসে তাঁর দুধে মুখ দেয়। কমলাকান্তের হাতে থাকা লাঠির আঘাতে বিড়ালটি চলে না গিয়ে মানুষের মতো যুক্তি ও ভাষায় তাঁর অধিকারের দাবি জানায়। তবে এখানে 

        'বিড়াল' প্রবন্ধটি মূলত দুটি প্রধান বিষয়ে আলোকপাত করে।আর সেই দুটি বিষয় হলো-

     ১) ধনীর শোষণ ও দরিদ্রের অধিকার। প্রবন্ধে আমরা দেখি-বিড়ালটি এখানে দরিদ্র, বঞ্চিত, শোষিত শ্রেণির প্রতীক। আবার অন্যদিকে, কমলাকান্ত ধনী, ক্ষমতাশালী বা সমাজপতি শ্রেণির প্রতীক।আর সেখানে বিড়াল শোষিত শ্রেণীর প্রতীক হয়ে যুক্তি দেয়, ক্ষুধার্ত অবস্থায় সে চুরি করেনি, কারণ খাবার মাত্রই ক্ষুধিতের অধিকার। ধনীরা অতিরিক্ত সম্পদ জমিয়ে রাখে, আর সেই কারণেই দরিদ্রদের চুরি করতে বাধ্য হতে হয়। আবার অন্যদিকে-

           বিড়াল বলে, ধনীরা পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করলেও তারা সেই অর্থ সদ্ব্যবহার না করে কেবল সঞ্চয় করে, যা সমাজের পক্ষে ক্ষতিকারক। তাদের উদ্বৃত্ত সম্পদ দরিদ্রের ক্ষুধার অন্ন যোগাতে ব্যবহৃত হওয়াই ন্যায়।

 ২) নৈতিকতার ধারণা ও আইনের সীমাবদ্ধতাঃ আলোচ্য প্রবন্ধে বিড়াল প্রশ্ন তোলে যে, চুরি করা যদি পাপ হয়, তবে দরিদ্রের খাদ্যের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যারা সম্পদ লুকিয়ে রাখে, সেই ধনীরা কি কম অপরাধী? আসলে-

           বিড়ালের ভাবনাটি প্রচলিত নীতিবোধ এবং আইন-শৃঙ্খলার ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন।আর সেকারণে বঙ্কিমচন্দ্র দেখালেন যে, আইন ও নীতি অনেক সময় শোষক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে।যার ফলে দরিদ্রের মৌলিক অধিকার অবহেলিত হয়। তিনি সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কেবল শাস্তির পরিবর্তে বৈষম্য দূর করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। আবার অন্যদিকে আমরা দেখি যে,

          আপাতত দৃষ্টিতে প্রবন্ধটি হাস্যরসাত্মক রচনা হলেও, এর মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র গুরুতর সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন।আফিং-এর ঘোরে কমলাকান্তের কল্পনাবিলাস ও বিড়ালের সাথে তাঁর তর্ক পাঠককে কৌতুক রঙ্গ রসের সাগরে ভাসিয়ে দেয়। তবে-

         বিড়াল ও কমলাকান্তের চরিত্র দুটি যথাক্রমে শোষিত ও শোষক শ্রেণির রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। শুধু তাই নয়,বঙ্কিমচন্দ্রের স্বভাবসিদ্ধ সাধু গদ্যরীতি ভাষা এখানে অত্যন্ত সরস, সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় রূপ নিয়েছে। আর সেই সাথে প্রবন্ধের সংলাপগুলো তীক্ষ্ণ ও যুক্তিপূর্ণভাবে প্রাবন্ধিক উপস্থাপিত করেছেন।

        পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,'বিড়াল' প্রবন্ধের মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শুধুমাত্র সমাজের বৈষম্য তুলে ধরেননি, বরং সমকালীন সমাজে মানবাধিকার, ন্যায় বিচার ও সাম্যের বার্তা দিয়েছেন, যা আজও প্রাসঙ্গিক। শুধু তাই নয়, সেই সাথে প্রবন্ধটিতে কৌতুকরস, ভাষার সহজবোধ্যতা অত্যন্ত স্যার সাথে এ সমাজের বক্ষে তুলে ধরেছেন।

       ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন, এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...