Skip to main content

করুণাহত্যা কী? করুণা হত্যার প্রকারভেদ আলোচনা করো।

করুণাহত্যা কী? করুণা হত্যার প্রকারভেদ আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার দর্শন, মাইনর)।

   •ইচ্ছামৃত্যু বা করুণাহত্যাঃ গ্রিক শব্দ 'Euthanasia' (ইউথানেসিয়া) এর অর্থ হল 'Good Death' বা 'শান্তি মৃত্যু'।আর এখানে করুণাহত্যা বা 'Mercy Killing' হলো এর একটি প্রতিশব্দ।আর এই প্রেক্ষিতে-

            ইচ্ছা মৃত্যু বা করুণাহত্যা (Euthanasia) বলতে বোঝায়- যখন কোনো ব্যক্তি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অসহনীয় যন্ত্রণায় ভোগেন এবং তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা থাকে না, তখন সেই ব্যক্তিকে তাঁর কষ্ট লাঘবের জন্য শান্তিপূর্ণ উপায়ে মৃত্যু ঘটাতে সহায়তা করা।

        •ইচ্ছামৃত্যু বা করুণাহত্যার প্রকারভেদ• 

        ইচ্ছা মৃত্যু বা করুণাহত্যাকে মূলত দুটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেণিবিভাগ করা যায়-

        ১)প্রয়োগের পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে এবং                      ২)রোগীর সম্মতির ওপর ভিত্তি করে। 

১) ইচ্ছামৃত্যু প্রয়োগের পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে প্রকারভেদ করা হয়।আর সেখানে এই পদ্ধতিতে করুণাহত্যার প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন হচ্ছে, তার ভিত্তিতে দুটি মূল ভাগ রয়েছে।আর সেই ভাগগুলি হল- 

      ক) সক্রিয় করুণাহত্যাঃ যখন সক্রিয়ভাবে কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করে বা বিশেষভাবে কাজ করে রোগীর জীবনাবসান ঘটানো হয়, তখন তাকে সক্রিয় করুণাহত্যা বলা হয়। যেখানে একজন চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত ব্যক্তি সরাসরি রোগীকে প্রাণঘাতী মাত্রার কোনো ওষুধ বা বিষ ইনজেকশন প্রয়োগ করেন, যার ফলে ঐ ব্যক্তির দ্রুত মৃত্যু ঘটে। এই মৃত্যুর উদাহরণে আমরা দেখি-

           রোগীর অসহনীয় কষ্ট লাঘবের জন্য শিরায় উচ্চ মাত্রার পটাসিয়াম ক্লোরাইড বা বারবিটুরেট জাতীয় ওষুধ প্রয়োগ করা।তবে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে এটি হত্যা (Homicide) হিসেবে গণ্য করা হয় এবং আইনত এই হত্যাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।আসলেএটি 'Mercy Killing'(করুণা হত্যা) নামেও পরিচিত।

         খ) নিষ্ক্রিয় করুণাহত্যাঃ যখন রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য দেওয়া কৃত্রিম জীবনদায়ী চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার ফলস্বরূপ রোগী তাঁর অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। তখন সেই মৃত্যুকে বলা হয় নিষ্ক্রিয় করুণাহত্যা।আর এই হত্যায় রোগীকে ভেন্টিলেটর (Ventilator) বা লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম খুলে নেওয়া হয়।আবার কৃত্রিমভাবে খাদ্য ও জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়াও রোগ নিরাময়ের জন্য জীবনদায়ী ওষুধ বা চিকিৎসার (যেমন অ্যান্টিবায়োটিকস) পরিসেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে এক্ষেত্রে-

           মৃত্যু ঘটানোর জন্য কোনো সক্রিয় কাজ করা হয় না। বরং বলা যেতে পারে রোগীর চিকিৎসা থেকে বিরত থাকা হয়। রোগীর অসুস্থতাই মৃত্যুর কারণ হয়, চিকিৎসা বন্ধ করা নয়।আর এই ব্যবস্থাটি অনেক দেশে, বিশেষত যখন রোগী 'পার্মানেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট' (Permanent Vegetative State - PVS) বা 'ব্রেন ডেথ' অবস্থায় থাকেন, তখন সীমিত শর্তসাপেক্ষে এটি অনুমোদিত।

)রোগীর সম্মতির ওপর ভিত্তি করে,রোগীর মানসিক অবস্থা এবং মৃত্যুর ইচ্ছার প্রকাশভঙ্গির ভিত্তিতে করুণাহত্যাকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।আর সেই মাইগুলি হলো-

      ক) ঐচ্ছিক করুণাহত্যাঃ যখন একজন সজ্ঞানে এবং স্বাধীনভাবে নিজের জীবনাবসানের জন্য স্পষ্ট সম্মতি বা অনুরোধ জানান তখন তাকে ঐচ্ছিক করুণা হত্যা বলা হয়।আর এখানে 

         রোগী অবশ্যই সম্পূর্ণ সচেতন এবং সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হবেন। শুধু তাই নয়,এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিণতি সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল থাকবেন। পাশাপাশি তিনি লিখিত বা মৌখিক ইচ্ছাপত্রে (Living Will) তাঁর জীবনাবসানের জন্য অনুরোধ করেছেন তার প্রকাশ্যে আনতে হবে।তবে ঐচ্ছিক করুণাহত্যায় চিকিৎসকের ব্যপক ভূমিকা থাকে।

       খ)অনৈচ্ছিক করুণাহত্যাঃযখন রোগী সম্মতি জানানোর মতো অবস্থায় থাকেন না বা তাঁর পক্ষে এরূপ সম্মতি দেওয়াও সম্ভব নয় তখন তাকে যে হত্যা করা হয় তাকে বলা হয় অনৈচ্ছিক করুণাহত্যা।আর এরূপ হত্যা করা হয় কোমায় আচ্ছন্ন ব্যক্তি,অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা ব্যক্তি, গুরুতর মানসিক অসুস্থতা বা নবজাতক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। তবে এখানে-

      রোগীর আইনগত অভিভাবক বা পরিবার রোগীর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে করুণাহত্যার সিদ্ধান্ত নেন। তবে  এই সিদ্ধান্ত সাধারণত সেই পরিস্থিতিতে নেওয়া হয়, যখন চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন যে রোগীর আর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

    গ) ইচ্ছাবিরোধী করুণাহত্যাঃ যখন একজন সক্ষম রোগী স্পষ্টভাবে জীবনাবসান চান না বা আপত্তি জানান, কিন্তু তবুও তাঁকে হত্যা করা হয়, তখন তাকে বলা হয় ইচ্ছাবিরোধী করুণাহত্যা। তবে-

        এই ইচ্ছাবিরোধী করুণাহত্যা সব দেশেই সম্পূর্ণরূপে অবৈধ। শুধু তাই নয় এটি সেইসব দেশে হত্যা বা খুন হিসেবে গণ্য হয়।যেখানে এটি কোনোভাবেই নৈতিক বা আইনি করুণাহত্যার সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না।

           পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,করুণাহত্যা বা ইচ্ছামৃত্যু একটি জটিল চিকিৎসাশাস্ত্রীয় এবং নৈতিক ও আইনি বিষয়।আর সেকারণে পরীক্ষার জন্য এই প্রকারভেদগুলি, বিশেষত সক্রিয় বনাম নিষ্ক্রিয় এবং ঐচ্ছিক বনাম অনৈচ্ছিক বিভাজনগুলি, সুসংগঠিতভাবে আলোচনা করা অপরিহার্য। করুণাহত্যার আইনি অনুমোদন শুধুমাত্র নিষ্ক্রিয় ও ঐচ্ছিক (কিছু ক্ষেত্রে অনৈচ্ছিক) শ্রেণির মধ্যেই সীমিত।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...