১৯৮৬ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি (National Policy on Education - NPE 1986)-তে উল্লিখিত প্রধান সুপারিশগুলো আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/Calcutta University পঞ্চম সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর)
আমরা জানি যে,১৯৮৬ সালের এই নীতি ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে এক নতুন দিশা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল। এই নীতির মূল ভিত্তি ছিল "শিক্ষার সর্বজনীনতা", "শিক্ষায় সমতা" এবং "শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি"।আর এই প্রেক্ষিতে জাতীয় শিক্ষানীতির সুপারিশ গুলি হল-
১)শিক্ষার কাঠামো ও জাতীয় সংহতিঃ দেশজুড়ে শিক্ষার একটি অভিন্ন কাঠামো (Uniform Structure) হিসেবে ১০+২+৩ ব্যবস্থা প্রবর্তনের সুপারিশ করা হয়। এটি ছিল শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয় সাধনের প্রাথমিক পদক্ষেপ। যেখানে জাতীয় পাঠক্রম, জাতীয় সংহতি, রক্ষার জন্য একটি জাতীয় মূল পাঠক্রম, প্রবর্তনের কথা বলা হয়। এই মূল পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলি হলো-
•ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস।•সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।• সাধারণ বিজ্ঞান ও গণিত।•সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রকৃতি সংরক্ষণ।
২)প্রাথমিক শিক্ষার সম্প্রসারণ ও গুণগত মান বৃদ্ধিঃ সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো জাতীয় শিক্ষানীতির একটি অন্যতম সুপারিশ ছিল।আর সেখানে এই নীতির প্রধান লক্ষ্য ছিল ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী সমস্ত শিশুর জন্য বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।এর পাশাপাশি-অপারেশন ব্ল্যাকবোর্ড মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলির পরিকাঠামো এবং শিক্ষার ন্যূনতম সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য এই ঐতিহাসিক কর্মসূচি চালু হয়। আর সেই কর্মসূচির সুবিধাগুলির মধ্যে ছিল-
কমপক্ষে দুটি কক্ষ।ন্যূনতম দুজন শিক্ষক (একজন মহিলা শিক্ষক আবশ্যক)।শিক্ষণ-শিখন সামগ্রী, ব্ল্যাকবোর্ড, মানচিত্র এবং খেলার সরঞ্জাম থাকবে। শুধু তাই নয়, সেইসাথে-
নবোদয় বিদ্যালয় প্রতিটি জেলায় "পেস-সেটিং স্কুল" হিসেবে এই আবাসিক বিদ্যালয়গুলি স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ প্রতিভাবান শিক্ষার্থীদের উন্নত ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করা।
৩) শিক্ষায় সমতা ও সামাজিক ন্যায়ঃশিক্ষাকে সামাজিক সমতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ওপর জোর দেওয়া হয়। যেখানে নারী শিক্ষার মাধ্যমে নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতায়ন-এর প্রধান মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আবার সেইসাথে পাঠ্যক্রম ও শিক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ-এর ওপর জোর দেওয়া হয়।এর পাশাপাশি দেখা যায়-
তফসিলি জাতি, উপজাতি ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণির শিক্ষা: তাদের জন্য বিশেষ আর্থিক সুবিধা (বৃত্তি/স্কলারশিপ), প্রাক্-শিক্ষণ কর্মসূচি এবং বিশেষ বিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। সেইসাথে- অক্ষম শিশুদের সাধারণ বিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়। আবার সেইসাথে-১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নিরক্ষরদের সাক্ষর করার জন্য জাতীয় সাক্ষরতা মিশন প্রতিষ্ঠা করার সুপারিশ করা হয়।
৪)বৃত্তিমূলক ও কারিগরী শিক্ষাঃ সাধারণ শিক্ষার উপর চাপ কমাতে এবং কর্মসংস্থান উপযোগী দক্ষতা বিকাশের জন্য মাধ্যমিক স্তরে বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রবর্তনের কথা বলা হয়। লক্ষ্য ছিল, ১৯৯৫ সালের মধ্যে ১০+২ স্তরের মোট শিক্ষার্থীদের প্রায় ২৫% কে এই বৃত্তিমূলক ধারায় নিয়ে আসা।
৫)শিক্ষক শিক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিঃ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নের জন্য ডিস্ট্রিক্ট ইনস্টিটিউট অফ এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং এবং কলেজ অফ টিচার এডুকেশনএর মতো প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে শিক্ষক শিক্ষা পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়।
৬)পরীক্ষা ও পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়নঃ বহিঃপরীক্ষার প্রাধান্য হ্রাস করে মুখস্থ বিদ্যার উপর নির্ভরশীলতা কমানো।আর সেখানে শিক্ষার্থীদের নিরবচ্ছিন্ন ও সামগ্রিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করার জন্য অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,১৯৮৬ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন এনে শিক্ষাকে আরও গণতান্ত্রিক, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সামাজিক চাহিদা-ভিত্তিক করে তোলার চেষ্টা করেছিল। শুধু তাই নয়, উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে গ্ৰেডপ্রথা চালু করার জন্য সুপারিশ করেছিল,যা আজ সমগ্র ভারতবর্ষে সমভাবে প্রচলিত।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏
Comments
Post a Comment