ইউরোপের ধর্ম সংস্কারের ফলাফল আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস, মাইনর)।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে, ইউরোপের ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। শুধু তাই নয় এই ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের ফলে গোটা ইউরোপের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে এক গভীর প্রভাব ফেলেছিল।আর সেই প্রভাবে আমরা দেখি যে-
•ধর্মীয় ক্ষেত্রে ফলাফল•
ক) খ্রিস্টান ধর্মের বিভাজনঃ ইউরোপের ধর্ম সংস্কারে খ্রিস্টান ধর্মের বিভাজন ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল। রোমান ক্যাথলিক চার্চ বিভক্ত হয়ে যায় এবং প্রটেস্ট্যান্ট (Protestant) নামে একটি নতুন ধর্মমত গঠিত হয়। উত্তর ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদ গ্রহণ করে ।যেমন- লুথারবাদ, ক্যালভিনবাদ প্রভৃতি।
খ)প্রতি-সংস্কার আন্দোলনঃ প্রটেস্ট্যান্টদের মোকাবিলা করতে এবং চার্চের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দূর করতে ক্যাথলিক চার্চ নিজেদের সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, যা প্রতি-সংস্কার আন্দোলন নামে পরিচিত।ট্রেন্ট কাউন্সিল এর মাধ্যমে চার্চ তাদের নীতি ও ধর্মীয় আচার-আচরণে পরিবর্তন আনে এবং জেসুইট নামে একটি শক্তিশালী ধর্মীয় গোষ্ঠী গঠন করে।
গ) পোপের ক্ষমতা হ্রাসঃধর্মীয় ক্ষেত্রে পোপের সার্বজনীন কর্তৃত্ব মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। বিভিন্ন দেশের রাজা ও শাসকরা চার্চের উপর তাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় স্বাধীন জাতীয় চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়।যেমন ইংল্যান্ডে অ্যাংলিকান চার্চ।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ফলাফল
ক) জাতীয়তাবাদের উত্থানঃধর্মীয় সংহতি ভেঙে যাওয়ায় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। শাসকরা পোপের হস্তক্ষেপ মুক্ত হয়ে নিজেদের রাষ্ট্রকে সংগঠিত করতে মনোযোগী হন। অন্যদিকে প্রটেস্ট্যান্ট দেশগুলিতে রাজারা চার্চের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে এবং চার্চের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করেন।
খ) ধর্মীয় যুদ্ধঃ এই আন্দোলনের ফলে ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্টদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ধর্মীয় সংঘাতের সৃষ্টি হয়, যার মধ্যে ত্রিশ বছরের যুদ্ধ অন্যতম, যা ইউরোপকে বিধ্বস্ত করে দেয়। আবার ধর্মীয় সংঘাতের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পেতে ধীরে ধীরে কিছু দেশে যেমন ফ্রান্সের নান্টেসের আদেশ ধর্মীয় সহনশীলতার নীতি চালু হয়।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ফলাফল
ক ) শিক্ষার প্রসারঃ প্রটেস্ট্যান্টরা বিশ্বাস করত যে প্রত্যেক বিশ্বাসীর বাইবেল পড়া উচিত। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পায়।
খ) ভাষার বিকাশঃ বাইবেল ল্যাটিন ভাষা থেকে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদের ফলে এই ভাষাগুলির গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। মার্টিন লুথার জার্মান ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করে জার্মান ভাষার মান গঠনে সহায়তা করেন। অতঃপর-
সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার মনে করেন যে ক্যালভিনের কঠোর পরিশ্রম ও সরল জীবনযাপনের নীতিগুলি প্রটেস্ট্যান্ট দেশগুলিতে পুঁজিবাদের বিকাশে সহায়ক হয়েছিল।আর সেখানে-
গ) ব্যক্তি স্বাধীনতাঃ ব্যক্তি ও ঈশ্বরের মধ্যে যাজকের মধ্যস্থতা ছাড়াই সরাসরি সংযোগ স্থাপনের ধারণার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় ক্ষেত্রে ব্যক্তি স্বাধীনতার ধারণা কিছুটা হলেও বিকশিত হয়। আসলে-
ধর্ম সংস্কার আন্দোলন ইউরোপের ইতিহাসে এক বিশাল পরিবর্তন এনেছিল, যা আধুনিক ইউরোপের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা সাজেশন এবং ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের "SHESHER KOBITA SUNDORBON" YOUTUBE CHANNEL 🙏
Comments
Post a Comment