বেলগাছিয়া নাট্যশালা কবে কাদের উদ্দ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়? বাংলা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে এই নাট্যশালার গুরুত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর)।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে, বাংলা নাট্য সাহিত্যের সূচনাপর্বে অনেক নাট্যশালা নিজেদেরকে নাট্য প্রেমীদের সম্মুখে বিকশিত করার সুযোগ পেয়েছিল।আর সেই সকল নাট্যশালার মধ্যে বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে 'বেলগাছিয়া নাট্যশালা' প্রতিষ্ঠা এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।কারণ মাত্র দু'জনের অতি উৎসাহে এই নাট্যশালাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর এই প্রেক্ষিতে সেখানে আমরা দেখি-
বেলগাছিয়া নাট্যশালা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে।আর সেদিন এই নাট্যশালাটি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোগ নিয়েছিলেন পাইকপাড়ার জমিদার দুই ভাই-রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ এবং রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ। তাঁদের বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে বর্তমান পাইকপাড়া অঞ্চলে এই শৌখিন নাট্যশালাটি স্থাপিত হয়েছিল। সেদিন যার নেপথ্যে মহারাজ যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের পরামর্শ ও উৎসাহও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
•বাংলা নাট্যসাহিত্যে বেলগাছিয়া নাট্যশালার গুরুত্ব•
বাংলা নাটকের বিবর্তন এবং আধুনিকায়নে বেলগাছিয়া নাট্যশালার অবদান অপরিসীম।কারণ মাইকেল মধুসূদন দত্তের আর্বিভাব হয় এই নাট্যশালাকে কেন্দ্র করে।তবে বেলগাছিয়া নাট্যশালার সবচেয়ে বড় অবদান হলো মাইকেল মধুসূদন দত্তকে নাট্যকার হিসেবে বাংলা সাহিত্যজগতে নিয়ে আসে।আর সেখানে আমরা দেখি-
বেলগাছিয়া নাট্যমঞ্চে রামনারায়ণ তর্করত্ন অনূদিত ‘রত্নাবলী’ নাটকের অভিনয় দেখে মধুসূদন অত্যন্ত হতাশ হন। শুধু তাই নয়, তিনি অনুভব করেন যে বাংলা ভাষায় মৌলিক ও উন্নতমানের নাটকের অভাব রয়েছে।আর এই অভাব পূরণেই তিনি কলম ধরেন এবং রচনা করেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ট্রাজেডি ও কমেডি নাটক। অতঃপর-
প্রথম সার্থক বাংলা নাটক মঞ্চস্থ হয়। আর সেই সূত্রে ১৮৫৯ সালে মধুসূদনের লেখা 'শর্মিষ্ঠা' নাটকটি এই মঞ্চেই অভিনীত হয়। এটি ছিল বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম সার্থক আধুনিক নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার ঘটনা। এর মাধ্যমে বাংলা নাটক সংস্কৃত রীতিনীতি থেকে বেরিয়ে আধুনিক ইউরোপীয় রীতির সঙ্গে পরিচিত হয়। সেই আধুনিকীকরণের হাত ধরে-
তৈরী হয় স্থায়ী ও উন্নত মঞ্চসজ্জা।তবে এর আগে বাংলা নাটক মূলত অস্থায়ী মঞ্চে বা বাবুদের জলসাঘরে অভিনীত হতো। বেলগাছিয়া নাট্যশালাতেই প্রথম স্থায়ী প্রেক্ষাগৃহ এবং ইউরোপীয় ধাঁচের আধুনিক মঞ্চসজ্জা ও আলোকসম্পাতের ব্যবহার করা হয়, যা বাংলা থিয়েটারকে পেশাদারিত্বের দিকে এক ধাপ এগিয়ে দেয়। যার ফলে-
বাংলা নাট্যমঞ্চে ঐকবাদন বা অর্কেস্ট্রার প্রবর্তন হয়। এই বেলগাছিয়া নাট্যশালাতেই প্রথম দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে 'ঐকবাদন' বা অর্কেস্ট্রার প্রচলন হয়।আর সেখানে ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী এবং যদুনাথ পাল ছিলেন এর মূল পরিচালক। এটি নাট্যমঞ্চের আবহ সংগীতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। আর সেই পরিবর্তনে-
বাংলা নাট্যপ্রেমীদের মধ্যে থেকে রুচিশীল দর্শক তৈরি হয়।স্থূল হাস্যরস বা ভাঁড়ামি বর্জিত সিরিয়াস বা ধ্রুপদী নাটক যে দর্শকদের আনন্দ দিতে পারে, তা এই নাট্যশালা প্রমাণ করেছিল।এটি শিক্ষিত ও রুচিশীল বাঙালি সমাজকে নাট্যমুখী করতে সাহায্য করে।আর এই প্রেক্ষিতে আমরা-
পরিশেষে বলতে পারি যে,যদিও ১৮৬১ সালে রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহের অকালমৃত্যুর পর এই নাট্যশালা বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু এর স্বল্পস্থায়ী জীবনেই এটি বাংলা নাট্যসাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। মধুসূদনের মতো প্রতিভাকে বিকশিত করার সুযোগ করে দিয়ে বেলগাছিয়া নাট্যশালা বাংলা সাহিত্যকে ঋণীকরে রেখেছে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের "SHESHER KOBITA SUNDARBAN" Youtube channel 🙏
Comments
Post a Comment