নাট্য নিয়ন্ত্রণ বিলের (১৮৭৬) উদ্দেশ্য ও তার প্রভাব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর)।
•নাট্য নিয়ন্ত্রণ বিল (১৮৭৬)-এর উদ্দেশ্য-
বাংলার নাট্য সাহিত্যের ইতিহাস থেকে আমরা জানি যে, ১৮৭৬ সালে 'নাট্য নিয়ন্ত্রণ বিল' বা অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৮৭৬ (The Dramatic ছিল বাংলার পক্ষে একটি কালা আইন।যে আইনের জেরে বাংলার রঙ্গমঞ্চকারী কর্মীদের কন্ঠরোধ করা হয়েছিল। আর এই আইন প্রনয়নে ব্রিটিশ সরকারের মূল উদ্দেশ্য ছিল-
নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের মূল ও একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনকারী রাজনৈতিক ও সমালোচনামূলক নাটকের অভিনয় নিষিদ্ধ করে সরকারের কর্তৃত্ব ও শাসনকে সুরক্ষিত করা। যেখানে-
•জনরোষের কন্ঠরোধ করতে ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ করতে এই নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মঞ্চকে ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী প্রচার-এর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া থেকে বিরত রাখা। আর সে কারণে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা মঞ্চে বিশেষত সাধারণ রঙ্গালয়ে দীনবন্ধু মিত্র, উপেন্দ্রনাথ দাস প্রমুখের লেখা নাটকগুলি সরাসরি ব্রিটিশ শাসন, নীলকর অত্যাচার, বা রাজকীয় তোষামোদের বিরুদ্ধে জনরোষ সৃষ্টি করছিল। শুধু তাই নয়, আমরা আরও দেখি যে-
• সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে এই নাট্য নিয়ন্ত্রণ বিল। আসলে তৎকালীন সময়ে নাটকের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের দুর্নীতি, ঔদ্ধত্য ও অত্যাচারের যে চিত্র তুলে ধরা হয়। যার ফলে জনসাধারণের মধ্যে সরকারের প্রতি প্রবল বিদ্বেষ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হতে থাকে। আর সেখানে এই আইন এনে সরকার বাংলার জনগণের সমালোচনার মুখ বন্ধ করতে চেয়েছিল।আবার-
• বাংলার আইন-শৃঙ্খলা সঠিক পথে পরিচালনার জন্য ব্রিটিশ সরকার দাবি করে যে, তৎকালীন সময়ে মঞ্চে অভিনয় নাটকগুলি সমাজে অশান্তি এবং উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। যার ফলে আইনশৃঙ্খলা বিনষ্ট হতে থাকে।তাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই এই নাট্য নিয়ন্ত্রণ বিল ভীষণ প্রয়োজন ছিল। শুধু তাই নয় -
•অশ্লীলতা নিবারণ করার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইনে অশ্লীলতা নিবারণের কথা ঘোষণা করে।কিন্তু এটি ছিল মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য একটি ছদ্ম-উদ্দেশ্য। যার প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করা।
•নাট্য নিয়ন্ত্রণ(১৮৭৬)বিলের প্রভাব•
আমরা জানি যে,নাট্য নিয়ন্ত্রণ বিলের প্রভাব ছিল বহু-মাত্রিক এবং সুদূরপ্রসারী। যার ফলে বাংলার নাট্য সাহিত্যের যেমন ক্ষতি হয় এবং পাশাপাশি নাট্যকর্মীদের ও জনসাধারণের জন্য রোড রোধ করা হয়। আসলে এই নাট্য নিয়ন্ত্রণ বিলের প্রভাব গোটা বাংলার নাট্য সমাজের ও সাহিত্যে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল।আর সেখানে আমরা দেখি-
• নাট্য জগতে প্রভাব •
•সৃষ্টিশীলতার অবদমন করার লক্ষ্যে এই আইন নাট্যকারদের সৃষ্টিশীলতাকে সরাসরি রুদ্ধ করে দিয়েছিল। কঠোর সেন্সরশিপের ভয়ে অনেক নাট্যকার রাজনৈতিক বা সামাজিক সমালোচনামূলক বিষয়বস্তু নিয়ে নাটক লেখা থেকে বিরত হন। যার ফলে নাট্য জগত ও নাট্যকর্মীরা হয়ে পড়েন ঠুঁটো জগন্নাথ। আবার অন্যদিকে-
•আত্ম-সেন্সরশিপ ভয় প্রদর্শন লক্ষ্যে নাটকের প্রযোজক ও পরিচালকরা শাস্তির ভয়ে এমন নাটক মঞ্চস্থ করা বন্ধ করে দেন। যা সামান্যতম ব্রিটিশ-বিরোধী বার্তা দিতে পারে। ফলে মঞ্চে নিরপেক্ষ বা অরাজনৈতিক নাটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং ব্রিটিশ বিরোধী নাটক রচনা ও অভিনয় বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর আমরা দেখি-
•ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক নাটকের উত্থান হয়।সরাসরি রাজনৈতিক নাটক নিষিদ্ধ হওয়ার পর, জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রকাশ করার জন্য নাট্যকাররা ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক কাহিনি-র আশ্রয় নিতে শুরু করেন।আর সেই সূচনালগ্নে আমরা দেখতে পাই-দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ-এর ঐতিহাসিক নাটকগুলিতে পরোক্ষভাবে দেশপ্রেমের বার্তা তুলে ধরা হয়। পরোক্ষ সেই দেশপ্রেমের বার্তা ব্রিটিশ সেন্সরশিপের নাগালের বাইরে অবস্থান করতে থাকে। আবার পাশাপাশি-
•রাজনৈতিক ও সামাজিকতায় প্রভাব•
রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আমরা দেখি যে, ভারতীয়দের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা হয়। আসলে এই আইন ভারতীয়দের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার-কে মারাত্মকভাবে আঘাত করেছিল। মঞ্চকে স্বাধীন চিন্তা ও সমালোচনার ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল, তা এই আইনের মাধ্যমে দমন করা হয়। আর তার ফলে-
•ভারতীয় শিক্ষিত সমাজে ক্ষোভ বৃদ্ধি পায়। আসলে এই দমনমূলক পদক্ষেপ ভারতের শিক্ষিত সমাজ এবং জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি আরও তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে।আর এটি প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, ব্রিটিশ সরকার সামান্যতম সমালোচনাও সহ্য করতে কোনমতেই প্রস্তুত নয়।আর সেই কারণে-
•বিকল্প সমাজ মাধ্যম ব্যবহারের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।নাটককে নিয়ন্ত্রণ করার ফলে জাতীয়তাবাদী চেতনা ছড়ানোর জন্য অন্যান্য মাধ্যম বিশেষ করে সংবাদপত্র, সাহিত্য, গুপ্ত সভার ওপর গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, আসলে নাট্য নিয়ন্ত্রণ বিল ছিল ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দমনমূলক নীতির একটি স্পষ্ট উদাহরণ। যদিও এটি সাময়িকভাবে ব্রিটিশ-বিরোধী প্রচারকে স্তব্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে এটি পরোক্ষভাবে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদের বীজকে আরও গভীরে প্রোথিত হতে সাহায্য করেছিল নিঃসন্দেহে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের "SHESHER KOBITA SUNDARBAN" Youtube channel 🙏
Comments
Post a Comment