ধর্ম সংস্কার আন্দোলনে মার্টিন লুথার (Martin Luther) র ভূমিকা আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পঞ্চম সেমিস্টার, ইতিহাস মাইনর)।
আমরা জানি যে, মার্টিন লুথার ছিলেন ইউরোপের ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের প্রাণপুরুষ, বিপ্লবী ও পথপ্রদর্শক।তাঁর ধর্মতাত্ত্বিক ধ্যানধারণা এবং চার্চের বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিবাদ ছিল ষোড়শ শতকের এই আন্দোলনের মূল অনুঘটক।বলা যায়, তার প্রচেষ্টায় ও অদম্য ইচ্ছা শক্তির প্রভাবে সমগ্র বিশ্বে খ্রিস্টধর্মের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল। তৎসহ নবজাগরণে এর প্রভাব লক্ষণীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল।আর সেখানে আমরা দেখি-
•মার্জনাপত্র বিক্রির প্রতিবাদঃ মার্টিন লুথার বিশ্বাস করতেন মানুষের সমস্ত কৃতকর্ম ঈশ্বর দ্বারা পূর্বনির্ধারিত। আর সেই কৃতকর্ম কোনদিন পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। সংস্কারের জন্য অর্থ আদায় করতে পোপ দশম লিও এর প্রতিনিধিরা টেটজেল১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে এসে মার্জনাপত্র বিক্রি করতে শুরু করেন। মার্টিন লুথার চার্চের এই অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং রুখে দাঁড়ান। আর সেখানে-
•৯৫ থিসিসঃ মাটির লুথার প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, মার্জনাপত্র বিক্রি আসলে পোপের একটি প্রতারণা মাত্র। চার্চ অন্যায়ভাবে সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে অর্থ আদায় করেছেন। শুধু তাই নয় অনুতাপই হচ্ছে পাপের প্রকৃত প্রায়শ্চিত্ত। তাই অনুতাপ চিত্তে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলেই পাপ মুক্ত হওয়া যায়।এর জন্য চার্চের দ্বারস্থ হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই।আর সেখানে-
•পোপের এই অন্যায় কাজকর্মের বিষয়ে লুথার ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে অক্টোবর মাসে ৯৫ টি প্রশ্ন রচনা করে তা উইটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় ঝুলিয়ে দেন এবং পোপের উত্তর দাবি করেন। মার্টিন লুথার উত্থাপিত এই ৯৫ টি প্রশ্ন "৯৫ থিসিস" নামে পরিচিত, যা সাধারণ মানুষের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এছাড়াও তিনি পোপের প্রাধান্যকে অস্বীকার করার পাশাপাশি ক্যাথলিক চার্চের নীতির বিরোধিতা করেন।সেইসাথে-
• ওয়ার্মসের ধর্মসভাঃ মার্টিন লুথার চিরাচরিত ধর্মীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। যার ফলে পোপ দশম চার্লস ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে ধর্মচ্যুত ঘোষণা করেন। সেখানে পোপের নির্দেশে সম্রাট পঞ্চম চার্লস "ওয়ার্মস" নামক স্থানে এক ধর্মসভায় লুথারকে নির্দেশ দেন যে, তাঁর ধর্মবিরোধী বক্তব্য গুলি প্রত্যাহার করতে। আর লুথার সেই নির্দেশ মানতে না রাজি হলে তাকে 'ধর্ম-বহির্ভূত' বলে ঘোষণা করে জার্মান সম্রাট শাস্তির ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেন।এমনকি পোপের নির্দেশে সম্রাট লুথারের প্রাণদণ্ডের আদেশ ঘোষণা করেন।
•লুথারের সমর্থন বৃদ্ধিঃ মাটির লুথার পোপবিরোধী ধর্মীয় মতবাদ প্রচারের জন্য ক্যাথলিক ধর্ম ছেড়ে বহু জার্মান সামন্ত, রাজা ও সাধারণ মানুষ লুথারের অনুগামী ও সমর্থকে পরিণত হন। আর ফলে জার্মানির প্রাশিয়া,স্যাক্সনি, ব্রান্ডেনবার্গ,হেসে, লুক্সেমবার্গ ইত্যাদি অঞ্চলে লুথারের মতবাদের ব্যাপক প্রসার ঘটে।যেখানে তিনি জার্মান ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করলে জার্মানরা পোপতন্ত্রের অনাচার সম্পর্কে আরো সচেতন হয়ে ওঠে।
•বিদ্রোহঃ লুথার নীতিতে বিশ্বাসী ও পোপের সমর্থনকারীদের মধ্যে জার্মানিতে গৃহযুদ্ধ বেধে যায়। কৃষকরা লুথারের সমর্থনে ১৫২৪-২৬ খ্রিস্টাব্দে জঙ্গি আন্দোলন শুরু করেন।তারা ক্যাথলিক চার্চের সম্পত্তি নষ্ট করেন ও বহু মানুষকে হত্যা করেন। শহরের শ্রমিকশ্রেণীও কৃষকদের সঙ্গে বিদ্রোহে যোগদান করে। ইতিমধ্যে গৃহযুদ্ধ চলাকালীন লুথারের মৃত্যু হয়।আর সেই সময়টা হলো১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই ফেব্রুয়ারি। অতঃপর-
•অগাসবার্গের সন্ধিঃ শেষপর্যন্ত ১৫৫৫ খ্রীষ্টাব্দে অগাসবার্গের সন্ধির দ্বারা জার্মানিতে গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। তবে সন্ধি অনুসারে "রাজার ধর্মই প্রজার ধর্ম" বলে স্বীকার করে নেওয়া হয়। যার ফলে উত্তর জার্মানির অধিকাংশ অঞ্চলে লুথারবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, মার্টিন লুথার চিরাচরিত ও প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করে তাঁর ধর্ম সংস্কার আন্দোলন পরিচালিত করেছিলেন। তাই তাঁর এই আন্দোলন প্রটেস্টান্ট বা প্রতিবাদী ধর্ম নামে অভিহিত হয়।তবে ক্রমেই তার মতবাদ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রসারিত হতে থাকে।আর সেখান থেকে জন্ম নেয় "লুথারিয়ান চার্চ"।আর এইভাবে খ্রিস্টান জগৎ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। যার ফলে পোপের অনুগামীরা ক্যাথলিক এবং লুথারের অনুগামীরা প্রটেস্ট্যান্ট নামে পরিচিত হয়।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 ।
Comments
Post a Comment