স্বামী বিবেকানন্দ-এর জীবনীমূলক প্রবন্ধ মহাবিপ্লবী সন্ন্যাসী (পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ দ্বাদশ শ্রেণী চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা)
ভূমিকা:ভারতের আধ্যাত্মিক আকাশে স্বামী বিবেকানন্দ এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। তিনি কেবল একজন সন্ন্যাসী ছিলেন না, ছিলেন এক মহান সমাজসংস্কারক, দেশপ্রেমিক এবং যুবশক্তির প্রতীক। তাঁর কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল অভয়বাণী- "বিরাজো হে বিশ্বরূপ!"
পরাধীন ভারতবর্ষের আত্মবিস্মৃত জাতিকে তিনি নতুন করে আত্মমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
•জন্ম ও বাল্যকালঃ১৮৬৩ সালের ১২ই জানুয়ারি উত্তর কলকাতার সিমলা অঞ্চলের এক অভিজাত দত্ত পরিবারে বিবেকানন্দ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশবের নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। পিতা বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন উচ্চ আদালতের আইনজীবী এবং মাতা ভুবনেশ্বরী দেবী ছিলেন অসামান্য ব্যক্তিত্বময়ী ও ধার্মিক নারী। বাল্যকাল থেকেই নরেন্দ্রনাথ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, সাহসী এবং আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসায় উন্মুখ।
•শিক্ষাজীবন ও শ্রীরামকৃষ্ণ লাভঃনরেন্দ্রনাথের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে এবং পরে তিনি জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশন (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ) থেকে বি.এ. পাস করেন। পাশ্চাত্য দর্শনে পণ্ডিত হয়েও তাঁর মনে ঈশ্বর লাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল। এই সময়েই তিনি দক্ষিণেশ্বরের সাধক শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সংস্পর্শে আসেন। শ্রীরামকৃষ্ণের স্পর্শে তাঁর সংশয় দূর হয় এবং তিনি উপলব্ধি করেন- "জীবের সেবা করাই হলো ঈশ্বরের প্রকৃত সেবা।"
শিকাগো ধর্মমহাসভা ও বিশ্ববিজয়ঃ১৮৯৩ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে আয়োজিত ‘ধর্মমহাসভা’য় তিনি ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তাঁর বক্তৃতার শুরুতেই- "Sisters and Brothers of America"
এই সম্বোধন শুনে উপস্থিত জনতা মুগ্ধ হয়ে দীর্ঘক্ষণ করতালি দেন। তিনি হিন্দুধর্মের উদারতা এবং বেদান্তের বাণী প্রচার করে বিশ্ববাসীর সামনে ভারতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। এরপর তিনি ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে বেদান্ত দর্শন প্রচার করেন।
•সমাজসেবা ও রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠাঃ১৮৯৭ সালে তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং তাঁর গুরু শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শে ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। "জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর"-এই আদর্শকে সামনে রেখে আর্তের সেবা ও দরিদ্রনারায়ণের সেবায় তিনি আত্মনিয়োগ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সেবাই হলো শ্রেষ্ঠ ধর্ম।
•দেশপ্রেম ও বাণীঃবিবেকানন্দের কাছে দেশপ্রেম ছিল ধর্মেরই নামান্তর। তিনি যুবসমাজকে আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, "উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত" (ওঠো, জাগো এবং লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত থেমো না)। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষিত ও চরিত্রবান যুবশক্তিই পারে ভারতবর্ষের পুনর্গঠন করতে। তাই তিনি বলেন- বীর্যবান হও, শ্রদ্ধাবান হও"
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,১৯০২ সালের ৪ঠা জুলাই মাত্র ৩৯ বছর বয়সে এই মহাপুরুষ মহাসমাধি লাভ করেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ আজো অমলিন। তাঁর জন্মদিনটিকে ভারতে ‘জাতীয় যুব দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। স্বামী বিবেকানন্দ আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে দেশপ্রেম ও বীরত্বের মূর্ত প্রতীক হিসেবে অমর হয়ে আছেন।
"বীর্যবান হও, শ্রদ্ধাবান হও"
Comments
Post a Comment