Skip to main content

চর্যাপদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আলোচনা করো।

চর্যাপদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আলোচনা করো পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর)

   •   'চর্যাপদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব' একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও বাঙালির নৃতাত্ত্বিক বিবর্তনে এর স্থান অনন্য। আর সেখানে এই চর্যাপদের আবিষ্কারকাল হলো ১৯০৭ সাল, যেটি আবিষ্কার করেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়।আর গ্ৰন্থটি প্রকাশ হয় ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা' নামে।আর সেখানে পদকর্তা হিসেবে ২৪ জন কবির নাম পাওয়া যায় (মতান্তরে ২৩ জন)।যেখানে এই চর্যাপদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিম্নাকারে আলোচনা করা হলো-

      চর্যাপদ অনুসারে আমরা জানি যে,১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবার থেকে 'চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়' বা চর্যাপদ আবিষ্কার করেন। এটি কেবল বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের সাধন-সংগীত নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এমন এক সন্ধিক্ষণের দলিল, যা না থাকলে বাংলা ভাষার উৎস ও প্রাচীন বাঙালির জীবনধারা চিরকাল অন্ধকারে থেকে যেত।

       ১)বাংলা ভাষার আদি রূপ নির্ণয়ে চর্যাপদের গুরুত্ব।চর্যাপদের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক গুরুত্ব হলো এর ভাষাতাত্ত্বিক অবদান। ভাষাবিদ ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর 'ODBL' গ্রন্থে বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, চর্যাপদই বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন। আর সেখানে এই চর্যাপদের বিবর্তন প্রমাণ করে যে, প্রাচীন ভারতের আর্য ভাষা থেকে প্রাকৃত ও অপভ্রংশের স্তর পেরিয়ে বাংলা ভাষা কীভাবে একটি স্বতন্ত্র রূপ লাভ করেছিল। শুধু তাই নয়-

       চর্যাপদের শব্দভাণ্ডার ব্যবহৃত অনেক শব্দ বিশেষ করে হাঁড়ি, কুঁড়িয়া, সাঁকো, পাণি আজও বাংলা ভাষায় প্রচলিত।

      ২) প্রাচীন বাংলার সমাজ-ইতিহাসের অন্যতম দলিল চর্যাপদ। তবে চর্যাপদ কোনো রাজা-বাদশাহর কাহিনী নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জীবনালেখ্য। আর সেই জীবনালেখ্যে জাতিভেদ প্রথা। আসলে তৎকালীন সমাজে যে বর্ণাশ্রম ও অস্পৃশ্যতা ছিল, ডোম ও চণ্ডালদের নগরের বাইরে বাসের বর্ণনা তার ঐতিহাসিক প্রমাণ। আবার- তৎকালীন সময়ে নারীর অবস্থান হিসেবে দেখি-সমাজে নারীদের স্বাধীনতা, বেশভূষা এবং শবরীদের ময়ূরপুচ্ছ ও গুঞ্জাফলের মালা পরার বর্ণনা তৎকালীন আদিম সমাজের সমাজতাত্ত্বিক তথ্য দেয়। এছাড়াও-

      ৩)ধর্মীয় বিবর্তন ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস হলো চর্যাপদ।চর্যাপদ ঐতিহাসিক দিক থেকে তৎকালীন ভারতের ধর্মীয় রূপান্তরের পরিচয় বহন করে।আর সেখানে এটি বৌদ্ধধর্মের মহাযান শাখা থেকে সহজযান বা নাথ ধর্মের বিবর্তনের ইতিহাস জানায়। শুধু তাই নয় -তৎকালীন সময়ে হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মের সংমিশ্রণে যে নতুন এক লোকায়ত জীবনদর্শন তৈরি হয়েছিল, তার পরিচয় এখানে পাওয়া যায়। এরই পাশাপাশি সমভাবে দেখি- 

     ৪)ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অতি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে চর্যাপদে।চর্যাপদের পদগুলি পাল আমলের শেষভাগ এবং সেন আমলের সূচনালগ্নের সামাজিক অস্থিতিশীলতার প্রতিচ্ছবি। আছে নদীমাতৃক বাংলার গঙ্গা-যমুনা নদীর উল্লেখ এবং নৌকা বা পারাপারের বর্ণনা থেকে বোঝা যায় প্রাচীন বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান বর্তমানের মতোই নদী-নির্ভর ছিল। এছাড়াও-

      অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কারণে মানুষের চরম দারিদ্র্য ও সামন্ততান্ত্রিক শোষণের যে চিত্র এখানে আছে, তা তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বুঝতে সাহায্য করে।

      ৫) নৃতাত্ত্বিক গুরুত্ব অসীম চর্যাপদ গুলিতে। বাঙালির খাদ্যাভ্যাস (মাছ, ভাত, হরিণের মাংস), আমোদ-প্রমোদ (দাবাড় খেলা, গান-বাজনা) এবং পেশার (তাতী, ধোপু, শিকারী) যে উল্লেখ চর্যাপদে আছে, তা বাঙালির নৃতাত্ত্বিক বিবর্তনের ইতিহাস রচনায় অপরিহার্য।

      পরিশেষে বলা যায় যে ,চর্যাপদ কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি প্রাচীন বাংলার অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। এটি যেমন বাংলা ভাষার জন্মপরিচয় নিশ্চিত করে, তেমনই হাজার বছর আগের এক অবহেলিত প্রান্তিক সমাজের জীবনসংগ্রামকে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী আসন দান করে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...