প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) প্রভাব ও ফলাফল আলোচনা করো(পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের (WBCHSE) চতুর্থ সেমিস্টার ও দ্বাদশ শ্রেণীর ইতিহাসের সিলেবাস অনুযায়ী)
আমরা জানি যে,১৯১৪ সালে শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা।তবে আমারা এখানে বলতে পারি এই যুদ্ধ কেবলমাত্র রণক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে আমূল বদলে দিয়েছিল।আর বদলে যাওয়ার সেই কাঠামোয় আমরা দেখি-
১)রাজনৈতিক প্রভাবঃপুরানো সাম্রাজ্যের যুদ্ধের ফলে ইউরোপের চারটি প্রধান রাজবংশ ও সাম্রাজ্যের পতন ঘটে- জার্মানির হোয়েনজোলার্ন, অস্ট্রো-হাঙ্গেরির হ্যাবসবার্গ, রাশিয়ার রোমানভ এবং তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্য।যার ফলে-
•নতুন রাষ্ট্রের উত্থানঃভার্সাই চুক্তি ও প্যারিস শান্তি সম্মেলনের মাধ্যমে ইউরোপের মানচিত্র বদলে যায়।আর তার ফলে-পোল্যান্ড, চেকোস্লোভিয়া, যুগোশ্লাভিয়া, ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়ার মতো নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। শুধু তাই নয় -
•একনায়কতন্ত্রের উত্থান: যুদ্ধের পরবর্তী বিশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক মন্দার সুযোগ নিয়ে ইতালিতে মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদ এবং জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসিবাদ-এর উত্থান ঘটে।
২)অর্থনৈতিক ফলাফল
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিঃ এই যুদ্ধে কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পত্তি নষ্ট হয়। ইউরোপের কৃষি ও শিল্প ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পড়ে। সেই সাথে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে দেশগুলো বিপুল ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে। মুদ্রাস্ফীতির ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়, বিশেষ করে জার্মানিতে অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেয়।আর সেখানেই -
•মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্যঃযুদ্ধের আগে ইউরোপ ছিল বিশ্বের মহাজন, কিন্তু যুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
৩)সামাজিক পরিবর্তন
•নারী শক্তির উত্থানঃ পুরুষরা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ায় কলকারখানা, অফিস ও কৃষিকাজে নারীরা যোগ দেন। এর ফলে নারী স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত হয় এবং অনেক দেশে নারীরা ভোটাধিকার লাভ করেন।
•শ্রমিক আন্দোলনঃ যুদ্ধের পর শ্রমিকদের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্বজুড়ে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন শক্তিশালী হয়। ১৯১৯ সালে 'আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা' (ILO) গঠিত হয়।
৪)লিগ অফ নেশনস বা রাষ্ট্রসংঘের প্রতিষ্ঠাঃবিশ্বে পুনরায় যাতে এই ধরনের ভয়াবহ যুদ্ধ না ঘটে, সেই উদ্দেশ্যে ১৯২০ সালে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য 'লিগ অফ নেশনস' প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই ছিল প্রথম বিশ্বজনীন শান্তিবাদী সংস্থা।
৫)ঔপনিবেশিক প্রভাব ও জাতীয়তাবাদঃযুদ্ধ চলাকালীন মিত্রশক্তি 'আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার'-এর কথা বলেছিল। এটি এশিয়া ও আফ্রিকার পরাধীন দেশগুলোতে (যেমন ভারত, মিশর, ভিয়েতনাম) জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে তীব্রতর করে তোলে। ভারতীয়রা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার দাবিতে আরও সোচ্চার হয়।
পরিশেষে বলা যায় যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কেবল একটি সামরিক সংঘর্ষ ছিল না, এটি ছিল আধুনিক বিশ্বের রূপকার। ভার্সাই চুক্তির কঠোর শর্তাবলি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা কার্যত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ বপন করে দিয়েছিল। তা সত্ত্বেও, এই যুদ্ধ বিশ্বকে আন্তর্জাতিকতাবাদের ধারণা এবং সামাজিক সাম্যের গুরুত্ব শিখিয়েছিল।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir, Hingalganj North 24 Parganas.
Comments
Post a Comment