Skip to main content

বিপ্রদাস পিপলাইয়ের 'মনসামঙ্গল' / ‘মনসা-বিজয়’ কাব্যের প্রথম পাঁচটি পালার বিষয়বস্তু সংক্ষেপে আলোচনা করো।

বিপ্রদাস পিপলাইয়ের 'মনসামঙ্গল' / ‘মনসা-বিজয়’ কাব্যের প্রথম পাঁচটি পালার বিষয়বস্তু সংক্ষেপে আলোচনা করো। এই অংশে লৌকিক ও পৌরাণিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় কীভাবে ঘটেছে? 

          আমরা জানি যে,পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে (১৪৯৪-৯৫ খ্রি.) কবি বিপ্রদাস পিপলাই তাঁর ‘মনসা-বিজয়’ কাব্য রচনা করেন। কাব্যের প্রথম পাঁচটি পালায় মূলত দেবখণ্ডের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এখানে লৌকিক দেবী মনসাকে পৌরাণিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার এক সার্থক প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়।আর সেই প্রয়াসে দেখি-

       সৃষ্টিতত্ত্ব ও দেবখণ্ডঃ কাব্যের শুরুতে শূন্যপুরাণের মতো জগত সৃষ্টির রহস্য বর্ণিত হয়েছে। এরপর শিব ও গৌরী (পার্বতী)র বিবাহ এবং তাঁদের গার্হস্থ্য জীবনের কাহিনী গুরুত্ব পেয়েছে।

     মনসার জন্মঃ কাহিনী অনুসারে শিবের বীর্য পদ্মপত্রে পতিত হলে সেখান থেকে এক সুন্দরী কন্যার জন্ম হয়-যিনি ‘পদ্মা’ বা ‘মনসা’। আসলে তিনি ছিলেন শিবের মানসকন্যা।

     শিব-মনসার সাক্ষাৎ ও দ্বন্দ্বঃ কালীদহে ভ্রমণকালে শিবের সঙ্গে মনসার দেখা হয়।মনসা নিজের পরিচয় দিলে শিব তাঁকে সাদরে কৈলাসে নিয়ে আসেন।কিন্তু সতীনের কন্যা মনে করে চণ্ডী (দুর্গা) মনসাকে প্রবল ঘৃণা ও ঈর্ষা করতে শুরু করেন।

       চণ্ডীর নিগ্রহ ও মনসার বিষদৃষ্টিঃঈর্ষান্বিত চণ্ডী একদিন মনসাকে প্রহার করলে, মনসার বিষদৃষ্টিতে চণ্ডী অচেতন হয়ে পড়েন। পরে শিবের অনুরোধে মনসা তাঁকে পুনরায় জীবনদান করেন।

       মনসার নির্বাসনঃপারিবারিক শান্তি রক্ষায় শিব নিরুপায় হয়ে মনসাকে বনে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। মনসা বিষণ্ণ মনে সিজিনি পর্বতে চলে যান এবং সেখানে নিজের আধিপত্য বিস্তারের পরিকল্পনা করেন।নেতা ধোপানি এই সময়ে তাঁর প্রধান সহায় ও পরামর্শদাত্রী হিসেবে অবতীর্ণ হন।

          লৌকিক ও পৌরাণিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় সমন্বিত মনসামঙ্গল।আর সেখানে বিপ্রদাসের কাব্যে আমরা দুই ধরনের বৈশিষ্ট্যের মিলন দেখি-

      পৌরাণিক কাঠামোঃবিপ্রদাস সংস্কৃত পুরাণে দক্ষ ছিলেন। তাই তাঁর কাব্যে মহাভারত ও ভাগবতের আদলে সৃষ্টিতত্ত্ব এবং শিবের মাহাত্ম্য গুরুত্ব পেয়েছে।মনসাকে তিনি কেবল লোকদেবী হিসেবে নয়, বরং মহাদেবের দুহিতা হিসেবে উচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন।

       লৌকিক সমাজচিত্রঃলৌকিক অংশে দেখা যায় বাঙালির চিরচেনা অভাব-অনটন এবং পারিবারিক কলহ। শিব এখানে একজন দরিদ্র শঙ্খধারী বৃদ্ধ, আর চণ্ডী ও মনসার বিবাদ হলো বাংলার সাধারণ ঘরোয়া সতীন-বিদ্বেষ বা কোন্দল।

      নেতা ধোপানিঃ এই চরিত্রে লৌকিক তান্ত্রিক বিশ্বাসের ছোঁয়া আছে।নেতা ধোপানি স্বর্গের অপ্সরা হলেও তাঁর মর্ত্যের ধোপানি রূপটি লৌকিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

          কবি বিপ্রদাস পিপলাই তাঁর প্রথম পাঁচটি পালায় কবি দেখিয়েছেন যে, মনসা কেবল প্রতিহিংসাপরায়ণ দেবী নন, তিনি পিতৃ স্নেহের কাঙাল এক কন্যা। বিপ্রদাসের বর্ণনাশৈলী এবং তৎসম শব্দের আধিক্য এই অংশটিকে অন্যান্য মনসামঙ্গল কাব্যের চেয়ে সাহিত্যগুণে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDORBON YOUTUBE CHANNEL 🙏 Samaresh Sir Hingalganj North 24 Parganas.


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...