'নবান্ন' নাটকের (১৯৪৪) গঠনশৈলী বা আঙ্গিক বিচার করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর)
বিজন ভট্টাচার্য প্রথাগত থিয়েটারের অলঙ্কারিক ভাষা ও কৃত্রিমতা বর্জন করে 'নবান্ন' নাটকে এক চরম বাস্তববাদী গঠনশৈলী গ্রহণ করেছিলেন।আর সেই গঠনশৈলীতে নির্মিত নবান্ন নাটকে আমরা দেখি-
•দৃশ্য পরিকল্পনা ও দ্রুত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছেন বিজন ভট্টাচার্য।'নবান্ন' নাটকে ৪টি অঙ্ক এবং মোট ১৫টি দৃশ্য রয়েছে। প্রথাগত নাটকের মতো দীর্ঘ সংলাপে দৃশ্য টেনে না নিয়ে, তিনি ছোট ছোট দৃশ্যের মধ্য দিয়ে কাহিনীর গতি বজায় রেখেছেন।আর সেখানে আমরা দেখি-
ট্রেনের কামরা, লঙ্গরখানা, কলকাতার রাস্তা কিংবা গ্রামের ধানের মাঠ-দৃশ্যের এই দ্রুত পরিবর্তন নাটকটিতে একটি সিনেমার মতো গতিময়তা দান করেছে।
•গণনায়ক বা সামষ্টিক চরিত্র সৃষ্টিতে বিজন ভট্টাচার্য অন্যতম বিশিষ্ট নাট্যকার।নবান্ন নাটকের অন্যতম প্রধান গঠনগত বৈশিষ্ট্য হলো কোনো একক 'নায়ক' বা 'নায়িকা'র অনুপস্থিতি।যেখানে প্রথাগত নাটকে একজন কেন্দ্রীয় চরিত্রকে কেন্দ্র করে ঘটনা আবর্তিত হয়। কিন্তু 'নবান্ন'-তে প্রধান সমাদ্দার, দয়াল, রাধিকা বা পঞ্চানন-সবাই মিলে একটি বৃহত্তর গ্রামীণ সমাজের প্রতিনিধি। এখানে ব্যক্তি নয়, বরং গোটা 'শোষিত কৃষক সমাজ'ই হলো নাটকের নায়ক।
•সংলাপ ও আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ এর সৃষ্টিকর্তা বিজন ভট্টাচার্য। যেখানে নাটকের গঠনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে বিজন ভট্টাচার্য মেদিনীপুর অঞ্চলের উপভাষা এবং গ্রামীণ মানুষের কথ্য ভাষা ব্যবহার করেছেন।আর সেখানে আমরা দেখি-
"মরণ নেই আমাদের, মরণ নেই"
আসলে এই ধরণের সংলাপের মধ্য দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকেই উচ্চাঙ্গের সাহিত্যিক মর্যাদা দিয়েছেন। ব্যাকরণসম্মত শুদ্ধ ভাষার বদলে মানুষের আবেগপ্রসূত ভাঙা ভাঙা ভাষা নাটকের গঠনকে আরও বাস্তবমুখী করেছে।
•ধ্বনি ও আলোকসম্পাতের ব্যবহার প্রথম সার্থক নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য।গণনাট্য আন্দোলনের সীমাবদ্ধ বাজেটের মধ্যেই বিজন ভট্টাচার্য শব্দের সার্থক প্রয়োগ করেছিলেন।আর সেখানে লঙ্গরখানার দৃশ্যে মানুষের হাহাকার, বৃষ্টির শব্দ বা ডুকরে কাঁদার শব্দকে তিনি নাটকের আবহ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এটি দর্শকদের মঞ্চের ঘটনার সাথে মানসিকভাবে যুক্ত করতে সাহায্য করে।
•লোকজ আঙ্গিক ও সংগীত ব্যাবহারে সফল নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য।নাটকটির গঠনে লোকনাট্যের (যেমন—যাত্রা বা গাজন) কিছু উপাদান সচেতনভাবে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।বিজন ভট্টাচার্য নিজে লোকগানে পারদর্শী ছিলেন। নাটকের সন্ধিক্ষণে গান বা ছড়াকে তিনি কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং কাহিনীকে এগিয়ে নেওয়ার সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এটি নাটকটিকে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।
•মঞ্চসজ্জায় প্রতীকীবাদ প্রথম ব্যাবহার হয় নবান্ন নাটকে।খুব সাধারণ চট, বাঁশ বা অতি সাধারণ উপকরণ দিয়ে মঞ্চ সাজিয়েও যে শক্তিশালী নাটক করা যায়, 'নবান্ন' তার প্রমাণ। মঞ্চের এক কোণে হয়তো একটি শুকনো গাছ বা ভাঙা কুঁড়েঘর—যা দিয়ে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা বোঝানো হয়েছে। এই ধরণের মিনিমালিজম আধুনিক বাংলা নাটকের পথপ্রদর্শক।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,'নবান্ন' নাটকের গঠনশৈলী আসলে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম মেনে চলেনি, বরং জীবনের প্রয়োজনে নতুন নিয়ম তৈরি করেছে। নাটকটি শেষ হয় কোনো ট্র্যাজেডিতে নয়, বরং 'নবান্ন' উৎসবের মধ্য দিয়ে এক আশাবাদী উত্তরণে। শোষণের অন্ধকার থেকে মুক্তির এই পথ দেখানোই ছিল এর কাঠামোগত সার্থকতা।
Comments
Post a Comment