Skip to main content

রাষ্ট্র ও হিংসা সম্পর্কে গান্ধীজীর দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করো।

রাষ্ট্র ও হিংসা সম্পর্কে গান্ধীজীর দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করো পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের CBCS সিলেবাস।

        আমরা জানি যে,গান্ধীজীর রাষ্ট্রচিন্তা তাঁর অহিংস দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাঁর মতে, রাষ্ট্র এবং অহিংসা একে অপরের পরিপন্থী।আর সেখানে-

         ১) রাষ্ট্র হলো একটি 'আত্মাহীন যন্ত্র'-গান্ধীজী রাষ্ট্রকে একটি যান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করতেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল-

"রাষ্ট্র একটি প্রাণহীন যন্ত্রের মতো, যা কখনোই হিংসা থেকে মুক্ত হতে পারে না, কারণ এর জন্মই হয়েছে হিংসার ভিত্তিতে।"

             মানুষের বিবেক বা আত্মা থাকে, কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো আত্মা নেই। তাই রাষ্ট্র কেবল আইনের ভয় এবং বলপ্রয়োগের (হিংসা) মাধ্যমেই নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে।

         ২)ঘনীভূত হিংসার প্রতীকঃগান্ধীজী মনে করতেন, একজন ব্যক্তি যদি হিংসা করে তবে তার একটি সীমা থাকে। কিন্তু রাষ্ট্র যখন হিংসা করে, তখন তা হয় প্রাতিষ্ঠানিক এবং ব্যাপক। রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং কারাগার—সবই হলো 'ঘনীভূত হিংসা'র প্রকাশ। রাষ্ট্র আইন মানতে মানুষকে বাধ্য করার জন্য যে শক্তি প্রয়োগ করে, গান্ধীজীর চোখে তা-ই হলো চরম হিংসা।

          ৩)রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তিগত স্বাধীনতাঃগান্ধীজী বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র যত শক্তিশালী হয়, মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং নৈতিকতা তত সংকুচিত হয়। রাষ্ট্র মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের ভেতরের নৈতিক গুণাবলিকে বিকশিত করতে পারে না। তিনি রাষ্ট্রকে একটি প্রয়োজনীয় মন্দ (Necessary Evil) হিসেবেও অনেক সময় মেনে নিলেও, একে আদর্শ বলে মনে করতেন না।

       ৪) রাষ্ট্রহীন সমাজের আদর্শঃহিংসামুক্ত সমাজের জন্য গান্ধীজী একটি 'রাষ্ট্রহীন গণতন্ত্র' বা 'আলোকিত অরাজকতা'র  স্বপ্ন দেখতেন।আর সেখানে তাঁর মতে-

 •এমন একটি সমাজে মানুষ নিজেরাই নিজেদের শাসন করবে (স্বরাজ)।

  •সেখানে পুলিশ বা সামরিক শক্তির প্রয়োজন হবে না কারণ সবাই নৈতিকভাবে সচেতন হবে।

 •একেই তিনি তাঁর কল্পিত 'রামরাজ্য' হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

           ৫)ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণঃযেহেতু রাষ্ট্র হিংসার ধারক, তাই গান্ধীজী ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ক্ষমতা রাষ্ট্রের কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে গ্রাম পঞ্চায়েতের হাতে আসুক (Gram Swaraj)। গ্রামের মানুষ যখন আত্মনির্ভর হবে, তখন রাষ্ট্রের এই হিংসাত্মক কাঠামোর ওপর তাদের নির্ভরতা কমে আসবে।আর সেখানে-

        গান্ধীজীর এই রাষ্ট্রচিন্তা মূলত একটি নৈরাজ্যবাদী দর্শন। তবে তিনি 'ব্যবহারিক আদর্শবাদী'ছিলেন বলে জানতেন যে, রাতারাতি রাষ্ট্রকে বিলুপ্ত করা সম্ভব নয়। তাই তিনি এমন একটি রাষ্ট্রের কথা বলেছিলেন যা হবে ন্যূনতম হস্তক্ষেপকারী এবং যার মূল ভিত্তি হবে জনসেবা ও অহিংসা।

         পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,গান্ধীজীর কাছে রাষ্ট্র ও হিংসা সমার্থক। তিনি মনে করতেন, সমাজ যত বেশি অহিংস হবে, রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা তত কমবে। তাঁর এই দর্শন আধুনিক যুগেও রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক হাতিয়ার।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...