গণনাট্য আন্দোলনে বিজন ভট্টাচার্যের অবদান আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তৃতীয় সেমিস্টার বাংলা মেজর)
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (IPTA) এবং বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের বাংলা নাট্য আন্দোলনে বিজন ভট্টাচার্য (১৯০৬-১৯৭৮) এক কালজয়ী নাম। সমাজমনস্কতা, শোষিত মানুষের আর্তি এবং নাট্য আঙ্গিকের আধুনিকীকরণে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।আর সেখানে গণনাট্য আন্দোলনে বিজন ভট্টাচার্যকে দেখি-
•পটভূমি ও গণনাট্য আন্দোলনের সূচনায় বিজন ভট্টাচার্য অন্যতম পথিকৃৎ।১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে যখন বাংলার জনজীবন বিপর্যস্ত, তখন ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের হাত ধরে 'ভারতীয় গণনাট্য সংঘ' প্রতিষ্ঠিত হয়। বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান স্থপতি। মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুম ড্রামা থেকে নাটককে বের করে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে।
•নবান্ন বিজন ভট্টাচার্যের এক যুগান্তকারী সৃষ্টি বলতেই হয়।১৯৪৪ সালে বিজন ভট্টাচার্যের রচিত ও অভিনীত 'নবান্ন' নাটকটি বাংলা নাটকের ইতিহাসে এক মাইলফলক। গণনাট্য আন্দোলনের প্রধান অস্ত্র ছিল এই নাটকটি।আর সেখানে নাটকটির বিষয়বস্তু-পঞ্চাশের মন্বন্তর এবং কৃষিজীবী মানুষের লড়াই এই নাটকের মূল উপজীব্য। তবে-
•নাটকেই প্রথম তথাকথিত 'হিরো'র বদলে সাধারণ কৃষক সমাজ 'যৌথ নায়ক' হিসেবে আবির্ভূত হয়।আর এটাই এই নাটকের স্বতন্ত্রতা। এছাড়াও শম্ভু মিত্র ও বিজন ভট্টাচার্যের যৌথ নির্দেশনায় 'নবান্ন' নাট্যপ্রয়োগে যে স্বাভাবিকতাবাদ হলো অভিনয় শৈলী,যা আগে কখনও দেখা যায়নি।
•লোকায়ত আঙ্গিক ও গণভাষা প্রয়োগের প্রাণপুরুষ বিজন ভট্টাচার্য বিজন ভট্টাচার্য বিশ্বাস করতেন, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে তাঁদের ভাষাতেই কথা বলতে হবে। তবে তিনি নাটকে উত্তরবঙ্গ বা মেদিনীপুরের লোকজ ভাষা ও উপভাষা অর্থাৎ আঞ্চলিক ভাষার সার্থক প্রয়োগ করেন। এখানে তাঁর নাটকে কীর্তন, গাজন বা লোকগানের সুর গণচেতনাকে আরও শাণিত করে তুলেছিল।আর এই প্রেক্ষিতে-
•গণনাট্য আন্দোলনের ধারায় তাঁর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নাটকগুলি হলো-•আগুন (১৯৪৩): মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে লেখা তাঁর প্রথম দিকের নাটক।•জবানবন্দীঃ দুর্ভিক্ষের গ্রাসে মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ও বাঁচার লড়াই এতে চিত্রিত •দেবীগর্জন (১৯৬৬): গ্রামীণ শোষণের বিরুদ্ধে কৃষক বিদ্রোহের এক বলিষ্ঠ চিত্র।•গর্ভবতী জননীঃউদ্বাস্তু সমস্যা ও প্রান্তিক মানুষের জীবন যন্ত্রণার প্রতিফলন।
•অভিনয় ও মঞ্চ নির্দেশনায় বিজন ভট্টাচার্য অনন্য নাট্যকার।বিজন ভট্টাচার্য কেবল নাট্যকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য অভিনেতা। 'নবান্ন' নাটকে 'প্রধান সমাদ্দার' চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে। তাঁর নির্দেশনায় নাটকে যে বাস্তববাদী অভিনয়ের ধারা শুরু হয়, তাকেই বলা হয় 'নব্যনাট্য আন্দোলন'-এর সূচনালগ্ন।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,বিজন ভট্টাচার্য মনে করতেন শিল্প হবে সমাজের দর্পণ এবং শোষিত মানুষের হাতিয়ার। গণনাট্য আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি নাটককে মুষ্টিমেয় শিক্ষিত মানুষের বিনোদনের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে সাধারণ মেহনতি মানুষের জীবন সংগ্রামের অঙ্গ করে তুলেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলা নাটক আধুনিকতা ও গণচেতনার মেলবন্ধনে নতুন রূপ লাভ করে।
তথ্যসূত্রঃবাংলা নাটকের ইতিহাস- অজিত কুমার ঘোষ।ভারতীয় গণনাট্য সংঘের ইতিহাস -পবিত্র সরকার।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.Hingalgaj, North 24 Parganas.
Comments
Post a Comment