পরিবেশগত নীতিশাস্ত্রের প্রধান লক্ষ্যসমূহ বা উদ্দেশ্যসমূহ আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, পঞ্চম সেমিস্টার, দর্শন মাইনার সিলেবাস)।
আমরা জানি যে,পরিবেশগত নীতিশাস্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো- মানুষের আচরণকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যাতে করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে।আর এই প্রেক্ষিতে পরিবেশগত নীতিশাস্ত্রের প্রধান লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য গুলি হল-
১)নৈতিক পরিধির বিস্তারঃসাধারণ নীতিশাস্ত্র কেবল মানুষের প্রতি মানুষের কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু পরিবেশগত নীতিশাস্ত্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো এই নৈতিক পরিধিকে প্রসারিত করে তার মধ্যে উদ্ভিদ, প্রাণী, নদী, পাহাড় এবং সমগ্র বাস্তুতন্ত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা। অর্থাৎ, মানুষ ছাড়াও প্রকৃতির অন্যান্য উপাদানের যে সহজাত মূল্য আছে, তা স্বীকার করা।
২)মনুষ্য-কেন্দ্রিকতা দূরীকরণঃ আমাদের প্রচলিত ধারণা ছিল যে, প্রকৃতি কেবল মানুষের ভোগের জন্য। পরিবেশগত নীতিশাস্ত্র এই সংকীর্ণ 'মনুষ্য-কেন্দ্রিক' চিন্তাধারাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। এর লক্ষ্য হলো মানুষকে এটি বোঝানো যে সে প্রকৃতির অধিপতি নয়, বরং প্রকৃতির একটি অংশ মাত্র।
৩)প্রাণীকুল ও উদ্ভিদের অধিকার রক্ষাঃপিটার সিঙ্গার বা টম রেগান-এর মতো দার্শনিকদের মতে, পরিবেশগত নীতিশাস্ত্রের একটি বড় লক্ষ্য হলো প্রাণীদের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়া এবং তাদের বাঁচার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া। একইভাবে, গাছপালা বা বনেরও যে বেঁচে থাকার অধিকার আছে, তা প্রতিষ্ঠা করা এই শাস্ত্রের অন্যতম উদ্দেশ্য।
৪ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায় ও দায়িত্বঃআমরা আজ যেভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করছি, তাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু অবশিষ্ট থাকবে কি না—তা নিয়ে পরিবেশগত নীতিশাস্ত্র প্রশ্ন তোলে। এর লক্ষ্য হলো স্থায়ী উন্নয়ন (Sustainable Development) নিশ্চিত করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সুস্থ ও বাসযোগ্য পৃথিবী পায়।
৫)বাস্তু-কেন্দ্রিক ভারসাম্য রক্ষা করাঃপরিবেশগত নীতিশাস্ত্রের লক্ষ্য হলো 'গভীর বাস্তুসংস্থান' এর আদর্শ প্রচার করা। এটি শেখায় যে প্রতিটি প্রজাতির বিলুপ্তি সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। প্রকৃতির প্রতিটি ক্ষুদ্র উপাদানের রক্ষা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য।
পরিশেষে আমাদের বলতেই হয় যে,পরিবেশগত নীতিশাস্ত্রের লক্ষ্য হলো মানুষকে পরিবেশের প্রতি সচেতন ও দায়বদ্ধ করা। এটি আমাদের শেখায় যে পরিবেশ রক্ষা কোনো করুণা নয়, বরং এটি আমাদের নৈতিক বাধ্যবাধকতা। প্রকৃতির প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে 'ভোগবাদী' থেকে 'সংরক্ষণবাদী' করে তোলাই এই শাস্ত্রের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য।
Comments
Post a Comment