Skip to main content

পিটার সিঙ্গার (Peter Singer) প্রাণীদের নৈতিক মর্যাদা সম্পর্কে কী বলেছেন? প্রাণীদের কি নৈতিক অধিকার থাকা উচিত? যুক্তিসহ ব্যাখ্যা করো।

পিটার সিঙ্গার (Peter Singer) প্রাণীদের নৈতিক মর্যাদা সম্পর্কে কী বলেছেন? প্রাণীদের কি নৈতিক অধিকার থাকা উচিত? যুক্তিসহ ব্যাখ্যা করো(পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার দর্শন মাইনর)

       আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,অস্ট্রেলীয় নীতি-দার্শনিক পিটার সিঙ্গার তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'অ্যানিমাল লিবারেশন'(1975)-এ প্রাণীদের নৈতিক মর্যাদা এবং অধিকার সম্পর্কে বৈপ্লবিক ধারণা প্রদান করেছেন।আর সেখানে প্রাণীদের নৈতিক মর্যাদা সম্পর্কে পিটার সিঙ্গারের দর্শন হিসেবে পরিগণিত। আসলে পিটার সিঙ্গার একজন উপযোগবাদী দার্শনিক। তাঁর মতে-নৈতিকতার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত-                                                                                  'সুখ বৃদ্ধি' এবং 'দুঃখ বা যন্ত্রণা হ্রাস'। 

         পিটার সিঙ্গার প্রাণীদের নৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কয়েকটি প্রধান যুক্তি দিয়েছেন।আর যুক্তিগুলি হলো-

      •সংবেদনশীলতা বা যন্ত্রণাভোগের ক্ষমতাঃসিঙ্গারের দর্শনের মূল ভিত্তি হলো 'সংবেদনশীলতা'। জেরেমি বেন্থামকে অনুসরণ করে তিনি বলেন, কোনো সত্তার নৈতিক মর্যাদা পাওয়ার প্রধান শর্ত হলো তার যন্ত্রণা বা কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা। তিনি যুক্তি দেন যে, একটি প্রাণী চিন্তা করতে পারে কি না বা কথা বলতে পারে কি না, সেটি বড় কথা নয়; বড় কথা হলো-

            "ওরা কি কষ্ট পেতে পারে?"। 

       যেহেতু প্রাণীরা ব্যথা ও কষ্ট অনুভব করতে পারে, তাই তাদের স্বার্থকে উপেক্ষা করা অনৈতিক।

         •স্বার্থের সমবিবেচনার নীতিঃপিটার সিঙ্গার মনে করেন যে, নৈতিক বিচারের ক্ষেত্রে কেবল মানুষের স্বার্থ দেখলে চলবে না, বরং সমান যন্ত্রণার ক্ষেত্রে মানুষের স্বার্থ এবং প্রাণীর স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। যদি একটি পাথরকে লাথি মারা হয়, তবে তার কোনো স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় না কারণ পাথর ব্যথা পায় না। কিন্তু একটি কুকুরকে লাথি মারলে সে ব্যথা পায়, তাই তার কষ্ট না পাওয়ার একটি 'স্বার্থ' আছে। সিঙ্গারের মতে, এই স্বার্থকে মানুষের সমান যন্ত্রণার সাথে সমমর্যাদা দিতে হবে।

      •প্রাণীদের কি নৈতিক অধিকার থাকা উচিত?যুক্তিসহ ব্যাখ্যা করো।

       পিটার সিঙ্গার প্রচলিত অর্থে 'অধিকার' শব্দটির চেয়ে 'স্বার্থ'রক্ষা করার ওপর বেশি জোর দিয়েছেন।তবে তাঁর যুক্তিগুলো প্রাণীদের নৈতিক অধিকারের সপক্ষেই জোরালো দাবি জানায়।আর সেই যুক্তিগুলি হলো- 

        •প্রজাতিবাদ বা স্পেসিসিজম এর বিরোধিতাঃসিঙ্গার 'প্রজাতিবাদ' শব্দটির মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, মানুষ যেমন গায়ের রঙের ভিত্তিতে বর্ণবাদ বা লিঙ্গের ভিত্তিতে লিঙ্গবৈষম্য (Sexism) করে, তেমনি প্রজাতির ভিত্তিতে প্রাণীদের ওপর শোষণ করাও একটি অন্যায় বৈষম্য। কেবল 'মানুষ' প্রজাতির সদস্য হওয়ার কারণে আমরা যদি প্রাণীদের কষ্ট দিই, তবে তা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়।

         •প্রান্তিক পর্যায়ের যুক্তিঃঅনেক সময় বলা হয় মানুষের বুদ্ধি বেশি বলে তাদের অধিকার বেশি।সিঙ্গার এর প্রতিবাদে বলেন, যদি বুদ্ধিই মানদণ্ড হয়, তবে শিশু বা মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা (যাদের বুদ্ধি অনেক প্রাণীর চেয়ে কম) কি নৈতিক অধিকার হারাবে? যেহেতু আমরা শিশুদের অধিকার দিই, তাই সমপর্যায়ের সংবেদনশীল প্রাণীদেরও অধিকার বা নৈতিক মর্যাদা থাকা উচিত।

         •উপযোগবাদী যুক্তিঃসিঙ্গার মনে করেন, সামান্য স্বাদের জন্য (মাংস খাওয়া) বা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য প্রাণীদের চরম কষ্ট দেওয়া 'বৃহত্তর সুখের' নীতির বিরোধী। কারণ মানুষের জিহ্বার ক্ষণিক স্বাদ প্রাণীর জীবন ও যন্ত্রণার চেয়ে বেশি মূল্যবান হতে পারে না।

            পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, প্রাণীদের নৈতিক মর্যাদা থাকা উচিত।কারণ তারা আনন্দ-বেদনা অনুভব করতে পারে। পিটার সিঙ্গার অবশ্য মানুষের সমান 'ভোটের অধিকার' বা 'ধর্মীয় অধিকার'-এর কথা বলেননি।বরং তিনি বলেন- যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার অধিকার এবং স্বার্থের সমমূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই তাঁর এই দর্শন আধুনিক 'প্রাণী অধিকার আন্দোলন'-এর প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর সেকারণেই পিটার সিঙ্গার বলেন-

 "নৈতিকতা কেবল মানুষের প্রতি কর্তব্য নয়, বরং প্রতিটি যন্ত্রণাকাতর প্রাণীর প্রতি দয়া ও ন্যায়বিচার প্রদর্শন করাই প্রকৃত মনুষ্যত্ব।"

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...