বাংলা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে গণনাট্য আন্দোলনের পটভূমি বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস)।
বাংলা নাটকের ইতিহাসে ১৯৪০-এর দশক এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সময়। এই সময় প্রথাগত বাণিজ্যিক থিয়েটারের খোলস ভেঙে আত্মপ্রকাশ করে 'ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ' (Indian People's Theatre Association - IPTA)। ১৯৪৩ সালের ২৫ মে বম্বেতে নিখিল ভারত সম্মেলন হলেও বাংলায় এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।আর সেখানে-
১. আন্দোলনের পটভূমি (Historical Background)
গণনাট্য আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল এক চরম সংকটের মুহূর্তে। এর নেপথ্যে কাজ করেছিল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ-
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা এবং বিশ্বজুড়ে ফ্যাসিবাদের বর্বরতা শিল্পীদের মনে গভীর রেখাপাত করে। ১৯৪২-এ ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘ গঠিত হয়, যা গণনাট্যের জমি তৈরি করে।
ব্রিটিশ সৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে বাংলার ১৩৫০ সালে পথে-ঘাটে মানুষের মৃত্যু নাট্যকারদের বিবেকের সামনে প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসিয়ে দেয়। তাঁরা বুঝতে পারেন, রাজপুত্র বা রূপকথার কাহিনী নয়, এখন অনাহারী মানুষের আর্তনাদ তুলে ধরাই শিল্পের কাজ।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন এবং ক্রমবর্ধমান শ্রেণীসংগ্রাম নাট্যকারদের গণমুখী হওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়।
্য তৎকালীন সাধারণ রঙ্গালয়ে কেবল 'বক্স অফিস' লক্ষ্য করে নাটক হতো। সমসাময়িক বাস্তবতাকে সেখানে উপেক্ষা করা হতো।
২. গণনাট্য আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য (Key Features)
এই আন্দোলনের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য বাংলা নাটককে এক নতুন রূপ দিয়েছিল।আর সেখানে-
শিল্পের জন্য শিল্প নয়, বরং মানুষের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে নাটককে ব্যবহার করা হতো।নতুন চরিত্রের উত্থান: কৃষক, শ্রমিক, মজুর এবং প্রান্তিক মানুষেরা প্রথমবারের মতো নাটকের নায়কের মর্যাদা লাভ করেন।
ভারী মঞ্চসজ্জা ত্যাগ করে 'মোবাইল থিয়েটার' বা ভ্রাম্যমাণ নাট্যদলের ধারণা জনপ্রিয় হয়। উঠান, খেলার মাঠ বা কারখানার গেটে নাটক মঞ্চস্থ হতে শুরু করে।
কোনো এক জন ব্যক্তির চেয়ে দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো।
শ্রেষ্ঠ ফসল: নবান্ন-গণনাট্য আন্দোলনের সবচেয়ে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হলো বিজন ভট্টাচার্যের 'নবান্ন' (১৯৪৪)। এই একটি নাটক বাংলা নাটকের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে লেখা এই নাটকে কোনো কৃত্রিম মেদ ছিল না, ছিল কঙ্কালসার মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। শম্ভু মিত্র ও বিজন ভট্টাচার্যের পরিচালনায় এই নাটকটি বাংলা থিয়েটারে 'বাস্তববাদ' প্রতিষ্ঠা করে।
৪. আন্দোলনের গুরুত্ব (Significance)
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম।আর সেখানে আমরা দেখি-
থিয়েটারকে ড্রয়িংরুম বা বিলাসবহুল হল থেকে বের করে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়।এর পরপরই গণনাট্য সঙ্ঘের সংহতি ভেঙে গেলেও এখান থেকেই জন্ম নেয় 'বহুরূপী', 'এল.টি.জি' (লিটল থিয়েটার গ্রুপ) বা 'পিউপিলস থিয়েটার'-এর মতো দলগুলো।আর সেখানে-
সংলাপের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষা এবং অভিনয়ের ক্ষেত্রে অতি-অভিনয় (Overacting) বর্জন করার রীতি এই আন্দোলনই শিখিয়েছিল। নাটক যে সমাজ পরিবর্তনের অস্ত্র হতে পারে, তা সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে যায়।
পরিশেষে বলা যায় যে, গণনাট্য আন্দোলন কেবল একটি নাট্যসংগঠন ছিল না, এটি ছিল একটি আদর্শ। যদিও রাজনৈতিক মতাদর্শের দ্বন্দ্বে পরবর্তীতে এই সঙ্ঘ দুর্বল হয়ে পড়েছিল, কিন্তু বাংলা থিয়েটারকে যে আধুনিক ও গণমুখী পথটি তারা দেখিয়েছিল, আজও পশ্চিমবঙ্গের নাট্যচর্চা সেই পথেই পরিচালিত হচ্ছে।
Comments
Post a Comment