Skip to main content

নবনাট্য আন্দোলন: সংজ্ঞা, পটভূমি ও গুরুত্ব আলোচনা করো ।

নবনাট্য আন্দোলন: সংজ্ঞা, পটভূমি ও গুরুত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস)।

          বাংলা নাটকের ইতিহাসে চল্লিশের দশকে প্রথাগত ও বাণিজ্যিক ধারার বিপরীতে যে গণমুখী ও প্রগতিশীল নাট্যচর্চার সূচনা হয়, তাকেই 'নবনাট্য আন্দোলন' বলা হয়। এটি কেবল নাট্যরীতির পরিবর্তন ছিল না, ছিল সমাজ পরিবর্তনের এক শৈল্পিক লড়াই।আর সেই -

১)আন্দোলনের পটভূমিঃ কোনো আন্দোলনই আকস্মিক নয়; নবনাট্য আন্দোলনের মূলে ছিল তৎকালীন ভয়াবহ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি-

         দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও মহাবীর্যঃযুদ্ধের অস্থিরতা এবং ১৯৪৩-এর (১৩৫০ বঙ্গাব্দ) ভয়াবহ মন্বন্তর বাংলার সমাজজীবনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। না খেতে পেয়ে মানুষের মৃত্যু নাট্যকারদের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়।

      ফ্যাসিবাদ বিরোধী চেতনাঃ বিশ্বজুড়ে ফ্যাসিবাদের উত্থানের বিরুদ্ধে শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছিলেন। ১৯৪২ সালে গঠিত হয় 'ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘ'।

       আই.পি.টি.এ বা গণনাট্য সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাঃ ১৯৪৩ সালে ‘ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ’ (IPTA) প্রতিষ্ঠিত হয়। এদের মূল মন্ত্র ছিল— "Art for people's sake" (জনগণের জন্য শিল্প)।

      প্রথাগত থিয়েটারের ব্যর্থতাঃ তৎকালীন বাণিজ্যিক থিয়েটারগুলিতে কেবল পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক রোমান্টিক নাটক মঞ্চস্থ হতো, যা বাস্তব জীবনের হাহাকার ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ ছিল।

২)• আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য (Features)

নবনাট্য আন্দোলন বাংলা নাটকের আঙ্গিক ও বিষয়বস্তু উভয় ক্ষেত্রেই আমূল পরিবর্তন আনে।আর সেই পরিবর্তনে আমরা দেখি-

     বাস্তববাদঃঅলৌকিকতা বা অতিপ্রাকৃত বিষয়ের বদলে সমসাময়িক সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যা, শোষণ এবং অনাহার নাটকের উপজীব্য হয়ে ওঠে।

      গণমুখী চরিত্রঃরাজপুত্র বা বীর যোদ্ধার বদলে কৃষক, শ্রমিক এবং মধ্যবিত্ত মানুষরা নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে উঠে আসেন।

      আঙ্গিক পরিবর্তনঃ জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চসজ্জা বা দামী পোশাকের বদলে 'স্বল্প ব্যয় ও নূন্যতম উপকরণে' নাটক করার রীতি শুরু হয়। খোলা ময়দানে বা রাস্তায় নাটক (Street Play) করার প্রবণতা বাড়ে।

      সংলাপ ও অভিনয়ঃ কৃত্রিম ও উচ্চকিত সংলাপের বদলে প্রাত্যহিক জীবনের স্বাভাবিক ভাষা ও চলিত রীতির ব্যবহার শুরু হয়। অভিনয়ের আতিশয্য বর্জন করা হয়।

       উদ্দেশ্যমুখিতাঃনিছক বিনোদন নয়, দর্শককে সচেতন করা এবং শোষণের বিরুদ্ধে সংহতি গড়ে তোলাই ছিল এই আন্দোলনের লক্ষ্য।

৩. উল্লেখযোগ্য নাটক ও ব্যক্তিত্ব

এই আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ ফসল হলো বিজন ভট্টাচার্যের 'নবান্ন' (১৯৪৪) নাটকটি। এছাড়া শম্ভু মিত্র, তুলসী লাহিড়ী (ছেঁড়াতার, পথিক), এবং সলিল চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 'নবান্ন' নাটকটি পরিচালনার মাধ্যমে শম্ভু মিত্র বাংলা থিয়েটারে এক নতুন যুগের সূচনা করেন।

. আন্দোলনের গুরুত্ব ও প্রভাব (Significance)

বাংলা নাট্যসাহিত্যে নবনাট্য আন্দোলনের প্রভাব অপরিসীম।

      নাটকের আধুনিকীকরণঃএই আন্দোলনই বাংলা নাটককে আধুনিক মনন ও সমাজমনস্কতার সাথে যুক্ত করে।

     গ্রুপ থিয়েটারের জন্মঃ গণনাট্য সঙ্ঘের সংহতি থেকে পরবর্তীতে 'বহুরূপী' (১৯৪৮) এর মতো শক্তিশালী গ্রুপ থিয়েটার বা দলবদ্ধ নাট্যচর্চার জন্ম হয়।

       সাধারণ মানুষের অধিকার: নাটক যে কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং প্রতিবাদের অস্ত্র হতে পারে- নবনাট্য আন্দোলন তা প্রমাণ করে।

        বিশ্বনাট্যের মেলবন্ধনঃ স্তানিস্লাভস্কি বা ব্রেখটের মতো বিদেশি নাট্যচিন্তার প্রয়োগ বাংলা মঞ্চে শুরু হয় এই আন্দোলনের হাত ধরেই।

       পরিশেষে বলা যায় যে, নবনাট্য আন্দোলন ছিল বাংলা নাটকের 'রেনেসাঁ'। এটি থিয়েটারকে ড্রয়িংরুম থেকে বের করে সাধারণ মানুষের আঙিনায় পৌঁছে দিয়েছিল। আজ আমরা যে সিরিয়াস বা জীবনমুখী নাট্যচর্চা দেখি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল এই আন্দোলনের মাধ্যমেই।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel channel 🙏 Samaresh Sir Hingalganj North 24 Parganas.


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...