বাংলা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে বেঙ্গল থিয়েটার প্রতিষ্ঠা ও নাট্যচর্চার ইতিহাস আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস)।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বাংলা নাট্যমঞ্চের ইতিহাসে ‘বেঙ্গল থিয়েটার’ একটি অবিস্মরণীয় নাম। এটি কেবল একটি রঙ্গমঞ্চ ছিল না, বরং বলা যায়,বাংলা পেশাদার নাট্যচর্চার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার কারিগর ছিল।আর সেই-
বেঙ্গল থিয়েটারের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন শরৎচন্দ্র ঘোষ।আর তাঁর এই কার্যে প্রধান সহযোগী ছিলেন বিহারীলাল চট্টোপাধ্যায়।এ ছাড়াও গুড়ুদাস চট্টোপাধ্যায় ও নীলমাধব চক্রবর্তী এই মহতী প্রচেষ্টায় শামিল ছিলেন বলে জানা যায়। সেই সময়কালটি হলো- ১৮৭৩ সালের ১৬ই আগস্ট এই থিয়েটারটি প্রতিষ্ঠিত হয়।যেটি কলকাতার ১০ নম্বর বিডন স্ট্রিটে (বর্তমান ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাজারের উত্তরে) অবস্থিত ছিল। তবে এই-
থিয়েটারটি ছিল কলকাতার প্রথম স্থায়ী রঙ্গমঞ্চ, যা কেবল নাট্যাভিনয়ের উদ্দেশ্যেই নির্মিত হয়েছিল (এর আগে অধিকাংশ থিয়েটার ছিল অস্থায়ী বা পারিবারিক)।
২)ঐতিহাসিক গুরুত্ব•
বেঙ্গল থিয়েটারের সবচেয়ে বড় অবদান হলো- এই মঞ্চেই প্রথমবার কোনো পেশাদার নাটকে নারীরা অভিনয় করেন। এর আগে পুরুষরাই নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন। শরৎচন্দ্র ঘোষের সাহসিকতায় জগত্তারিণী, গোলাপ (পরবর্তীতে সুকুমারী দত্ত), এলোকেশী ও শ্যামা নাম্নী চারজন বারাঙ্গনা এই মঞ্চে যোগ দেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।
৩) অভিনীত নাটকের ইতিহাস
বেঙ্গল থিয়েটারের নাট্য-ইতিহাসকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়।আর সেই ভাগ গুলি হলো-
•বেঙ্গল থিয়েটারের উদ্বোধন হয়েছিল মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'শর্মিষ্ঠা' নাটক দিয়ে। মাইকেল নিজে এই থিয়েটারের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুশয্যায় থাকাকালীন তাঁরই উপদেশে এই মঞ্চের জন্য 'মায়াকানন' ও 'বিষধনু' (অসমাপ্ত) নাটক দুটি গ্রহণ করা হয়েছিল।
•মধুসূদনের মৃত্যুর পর এই মঞ্চের প্রধান নাট্যকার হয়ে ওঠেন বিহারীলাল চট্টোপাধ্যায়। তাঁর পৌরাণিক ও সামাজিক নাটকগুলি এখানে জনপ্রিয় হয়। উল্লেখযোগ্য নাটকগুলি হলো-•শকুন্তলা (১৮৭৩)•রাবণবধ•পাণ্ডব নির্বাসন।
•বেঙ্গল থিয়েটারই প্রথম বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের সফল নাট্যরূপ মঞ্চস্থ করে দর্শকদের মাতিয়ে রেখেছিল।আর সেদিন মৃণালিনী ১৮৭৪ সালে অভিনীত এই নাটকটি অভাবনীয় সাফল্য পায়। পাশাপাশি কপালকুণ্ডলা ও দুর্গেশনন্দিনী বঙ্কিমচন্দ্রের এই কালজয়ী উপন্যাসের নাট্যরূপও এখানে মঞ্চস্থ হয়েছিল। এছাড়াও-
পরবর্তী সময়ে রাজকৃষ্ণ রায়ের পৌরাণিক নাটক ও গীতিনাট্য (যেমন: 'প্রহ্লাদ চরিত্র') বেঙ্গল থিয়েটারের আর্থিক সংকট দূর করতে সাহায্য করেছিল।
বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে বেঙ্গল থিয়েটারের গুরুত্ব নিম্নরূপভাবে আলোচনা করা হলো। আর সেখানে আমারা দেখি- বেঙ্গল থিয়েটার শখের থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এসে পেশাদার থিয়েটারের কাঠামো তৈরি করেছিল। যেখানে নটীদের মঞ্চে এনে নাটকের বাস্তবতাকে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়-
১৮৭৩ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে এই থিয়েটারটি (মাঝে নাম পরিবর্তন করে 'রয়্যাল বেঙ্গল থিয়েটার') বাংলা সংস্কৃতিকে পুষ্ট করেছে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, শরৎচন্দ্র ঘোষের হাত ধরে বিডন স্ট্রিটের এই ছোট চুন-সুড়কির দালানটিই বাংলা থিয়েটারকে আধুনিকতার প্রবেশদ্বার দেখিয়েছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে নাটকের নেশা ছড়িয়ে দিতে এবং বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদগুলোকে (মধুসূদন ও বঙ্কিমচন্দ্রের রচনা) সাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে বেঙ্গল থিয়েটারের ভূমিকা অতুলনীয়।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDORBON YOUTUBE CHANNEL 🙏 Samaresh Sir Hingalganj North 24 Parganas.
Comments
Post a Comment