Skip to main content

পাবলো নেরুদার 'অসুখী একজন' কবিতা

পাবলো নেরুদার 'অসুখী একজন' কবিতার মূল বিষয়বস্তু আলোচনা করো পশ্চিমবঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ দশম শ্রেণি বাংলা প্রথম সেমিস্টার।

         আমরা কবিতার শুরুতে দেখতে পাই- কথক তার প্রিয়তমাকে দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে এক অনিশ্চিত গন্তব্যে চলে যান। তবে সেই মেয়েটি ছিল একনিষ্ঠ অনুরাগের প্রতীক। কিন্তু সে জানত না যে, তার প্রিয়জন আর কোনোদিন ফিরবে না! এভাবেই বছরের পর বছর কেটে যায়।আর কথকের ফেলে যাওয়া পথে ঘাস জন্মায়, কিন্তু মেয়েটির প্রতীক্ষার শেষ হয় না। তবে -

           শান্তিপূর্ণ সময়ের অবসান ঘটিয়ে হঠাৎ ধেয়ে আসে ভয়ংকর যুদ্ধ। কবি একে 'রক্তের এক আগ্নেয় পাহাড়ের' সাথে তুলনা করেছেন।যুদ্ধের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় সাধারণ মানুষের সাজানো ঘরবাড়ি, স্মৃতিমাখা আসবাব (যেমন—গোলাপি গাছ, জলতরঙ্গ, চিমনি)। এমনকি মন্দিরে ধ্যানমগ্ন দেবতারাও এই ধ্বংসলীলা থেকে রেহাই পান না; তাঁরাও টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়েন।আর-

       যুদ্ধের বীভৎসতায় চারিদিকে শুধু ছড়িয়ে থাকে ধ্বংসস্তূপ, কাঠকয়লা আর দোমড়ানো লোহা।শহরটি এক জনশূন্য শ্মশানে পরিণত হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত মৃত্যু আর ধ্বংসের মাঝেও দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটির মৃত্যু হয় না।আসলে-

         যুদ্ধ সভ্যতা, স্থাপত্য এবং মানুষকে ধ্বংস করতে পারলেও মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও প্রতীক্ষাকে বিনাশ করতে পারে না। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটি আসলে অপরাজেয় মানবিক প্রেমেরই প্রতীক।


পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের দশম শ্রেণির প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষার উপযোগী 'অসুখী একজন' কবিতার গুরুত্বপূর্ণ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর ।

    ১)"সে জানত না আমি আর কখনো ফিরে আসব না" — এখানে 'সে' কে?

উত্তরঃ পাবলো নেরুদার 'অসুখী একজন' কবিতায় 'সে' বলতে কথকের জন্য অপেক্ষারত সেই দরজায় দাঁড়ানো মেয়েটির কথা বলা হয়েছে।

     ২)"রক্তের এক আগ্নেয় পাহাড়ের মতো" কী এল?

উত্তর: কবিতার কথক চলে যাওয়ার অনেক বছর পর সমতলে শান্ত পরিস্থিতি বিঘ্নিত করে ভয়াবহ 'যুদ্ধ' রক্তে এক আগ্নেয় পাহাড়ের মতো এল।

     ৩)"বৃষ্টিতে ধুয়ে দিল আমার পায়ের চিহ্ন" — এর তাৎপর্য কী?

উত্তর: সময়ের অমোঘ নিয়মে কথকের ফেলে যাওয়া স্মৃতি বা চিহ্ন যে ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে এবং দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে, তা বোঝাতেই এই পঙ্‌ক্তিটি ব্যবহৃত হয়েছে।

     ৪)"শান্ত হলুদ দেবতারা" কোথায় কীভাবে ছিল?

উত্তর: শান্ত হলুদ দেবতারা মন্দিরের ভেতরে হাজার বছর ধরে ধ্যানে মগ্ন অবস্থায় শান্তভাবে অবস্থান করছিল।

      ৫) যুদ্ধের ফলে দেবতাদের কী দশা হয়েছিল?

উত্তরঃযুদ্ধের তাণ্ডবে মন্দিরের শান্ত দেবতারা উল্টে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল, অর্থাৎ প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসও যুদ্ধের ধ্বংসলীলা থেকে রক্ষা পায়নি।

      ৬) "যেখানে ছিল শহর / সেখানে ছড়িয়ে রইল..." — কী ছড়িয়ে রইল?

উত্তরঃযুদ্ধের ধ্বংসলীলার পর শহরের জায়গায় ছড়িয়ে রইল কাঠকয়লা, দুমড়ানো লোহা আর মৃত পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা।

      ৭)"সব চূর্ণ হয়ে গেল, জ্বলে গেল আগুনে" — কী কী চূর্ণ ও দগ্ধ হয়েছিল?

উত্তরঃকথকের মিষ্টি বাড়ি, বারান্দার ঝুলন্ত বিছানা, গোলাপি গাছ, প্রাচীন জলতরঙ্গ—অর্থাৎ শান্ত জীবনের সমস্ত স্মৃতি যুদ্ধের আগুনে ছাই হয়ে গিয়েছিল।

     ৮)"সেই মেয়েটির মৃত্যু হলো না" — কেন মেয়েটির মৃত্যু হলো না?

উত্তর: যুদ্ধ ধ্বংস ও মৃত্যু নিয়ে এলেও মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শাশ্বত প্রতীক্ষাকে বিনাশ করতে পারে না। মেয়েটি এখানে অমর ও অপরাজেয় ভালোবাসার প্রতীক, তাই তার মৃত্যু হয় না।

      ৯)'অসুখী একজন' কবিতাটি কে বাংলায় অনুবাদ করেছেন?

উত্তরঃ পাবলো নেরুদার এই কবিতাটি 'বিদেশি কবিতা' গুচ্ছের অন্তর্গত এবং এটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন কবি নবারুণ ভট্টাচার্য।

     ১০)কবিতার শেষে 'রক্তের একটা কালো দাগ' কিসের প্রতীক?

উত্তর: যুদ্ধের নৃশংসতা এবং তার ফলে ঘটে যাওয়া ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের এক স্থায়ী কলঙ্কিত চিহ্ন হিসেবে 'কালো দাগ' কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে।

         (পাবলো নেরুদার চিলিয়ান কবিতা 'La Desdichada'-র নবারুণ ভট্টাচার্য অনূদিত 'অসুখী একজন' কবিতাটি দশম শ্রেণির পাঠ্যবসূচির একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল রচনা)।

পাবলো নেরুদা র 'অসুখী একজন' কবিতার মূল বিষয়বস্তু আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ দশম শ্রেণি বাংলা প্রথম সেমিস্টার)।

       আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,কবিতাটির মূল উপজীব্য হলো যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং তার বিপরীতে শাশ্বত ও অপরাজিত ভালোবাসার জয়গান।আর সেই জয়গানে দেখি-

        কথক (বিপ্লবী বা যোদ্ধা) তার প্রিয়তমাকে দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে দূরে চলে যান। সেই মেয়েটি জানত না যে তার প্রিয়জন আর কোনোদিন ফিরবে না। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়, যার প্রতীক হিসেবে কবিতায় ঘাস জন্মানো বা বৃষ্টির দাগ ধুয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।আর সেখানে কথককে বলতে শুনি-

"সে জানত না আমি আর কখনো ফিরে আসব না।"

        বছরগুলো পাথরের মতো একটার পর একটা নেমে আসে। সময়ের এই দীর্ঘতা বোঝাতে নেরুদা চমৎকার রূপক ব্যবহার করেছেন। কবির কথায়-

 "তারপর যুদ্ধ এল / রক্তে এক আগ্নেয় পাহাড়ের মতো।"

          যুদ্ধের আগমনে শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। শহর জ্বলে ওঠে, দেবতারা মন্দির থেকে উল্টে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যান। সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি, স্মৃতি—সবই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

"শান্ত হলুদ দেবতারা / যারা হাজার বছর ধরে / ডুবে ছিল ধ্যানে / উল্টে পড়ল মন্দির থেকে টুকরো টুকরো হয়ে।"

           যুদ্ধের লেলিহান শিখা সবকিছুকে ছাই করে দিলেও দরজায় প্রতীক্ষারত সেই মেয়েটির মৃত্যু হয় না। ধ্বংসের স্তূপের মাঝেও ভালোবাসা ও মানবিকতা অম্লান থাকে।

"সব চূর্ণ হয়ে গেল, জ্বলে গেল আগুনে। / ... শুধু সেই মেয়েটি মরল না।"

         মোটকথা হলো, যুদ্ধ কেবল জনপদ বা স্থাপত্য ধ্বংস করে না, তা অসংখ্য সম্পর্ককে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। কিন্তু সব হারিয়ে গেলেও অপেক্ষারত ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে—এটাই কবিতার মূল বার্তা। নেরুদা এখানে যুদ্ধের নৃশংসতাকে ধিক্কার জানিয়ে মানবিক আবেগের জয়গান গেয়েছেন।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...