Skip to main content

স্বামীজিকে যেরূপ দেখিয়েছি গ্রন্থে স্বামীজীর সঙ্গে নিবেদিতার প্রথম সাক্ষাতের যে ছবি ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো।

স্বামীজিকে যেরূপ দেখিয়েছি গ্রন্থে স্বামীজীর সঙ্গে নিবেদিতার প্রথম সাক্ষাতের যে ছবি ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো। (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর )।

         আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ভগিনী নিবেদিতা রচিত 'স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়েছি' (The Master as I Saw Him) গ্রন্থটি স্বামী বিবেকানন্দের ব্যক্তিত্ব ও দর্শনের এক অমূল্য দলিল। এই গ্রন্থের প্রথম পরিচ্ছেদে লেখিকা মার্গারেট নোবেল (পরবর্তীতে নিবেদিতা)-এর সঙ্গে স্বামীজীর সেই ঐতিহাসিক প্রথম সাক্ষাতের এক জীবন্ত চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। ১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসে লন্ডনের এক ড্রয়িং রুমে তাঁদের এই মিলন ঘটেছিল, যা কেবল মার্গারেটের জীবন নয়, ভারতের ইতিহাসের গতিপথও বদলে দিয়েছিল। আর সেই প্রেক্ষিতে নিবেদিতার বর্ণনায় স্বামীজীর সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের মূল দিকগুলি নিচে আলোচনা করা হলো-

       সাক্ষাতের পটভূমি ও পরিবেশে আমরা দেখতে পাই-লন্ডনের লেডি ইসাবেল মার্জেসন-এর বাড়িতে এক ঘরোয়া পরিবেশে স্বামীজীর সঙ্গে নিবেদিতার প্রথম আলাপ হয়। নিবেদিতা তখন এক জিজ্ঞাসু ও বিচারপ্রবণ মন নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, স্বামীজী একটি ঘরের কোণে মেঝেতে আগুনের কুণ্ডলীর সামনে বসে আছেন। নিবেদিতা সেই মুহূর্তের শান্ত ও গম্ভীর পরিবেশের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন-

 "তিনি আগুনের শিখার সামনে মেঝেতে বসেছিলেন এবং তাঁর চারপাশ ঘিরে ছিল এক নিস্তব্ধ প্রশান্তি।"

        প্রথম দর্শনে স্বামীজীর রূপ ও ব্যক্তিত্ব অনুভব করে নিবেদিতা লক্ষ্য করেছিলেন যে, স্বামীজীর পোশাক ছিল অতি সাধারণ, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল রাজকীয়। তাঁর গেরুয়া বসন এবং উজ্জ্বল চোখ নিবেদিতার মনে এক গভীর রেখাপাত করেছিল। লেখিকা বর্ণনা করেছেন যে, স্বামীজী কোনো কৃত্রিম পাণ্ডিত্য জাহির করেননি, বরং অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিলেন। নিবেদিতার ভাষায়-

"তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল কোনো প্রাচীন ঋষি যেন বর্তমানের প্রেক্ষাপটে কথা বলছেন।"

      কথোপকথন ও শিক্ষার ধরনে প্রথম সাক্ষাতেই নিবেদিতা স্বামীজীর শিক্ষা দেওয়ার অদ্ভুত ভঙ্গিটি লক্ষ্য করেন। স্বামীজী কোনো তর্কের মধ্যে না গিয়ে গল্পের ছলে গভীর আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করছিলেন। তিনি বুদ্ধদেব এবং উপনিষদের বাণী এমনভাবে ব্যাখ্যা করছিলেন যা নিবেদিতার মতো যুক্তিবাদী মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল। নিবেদিতা সেই প্রথম দিনের আলোচনা প্রসঙ্গে লিখেছেন:

 "তিনি আমাদিগকে ধর্মের কোনো নতুন তত্ত্ব দিচ্ছিলেন না, বরং আমাদের সত্তার গভীরে নিহিত সত্যকে চিনিয়ে দিচ্ছিলেন।"

      নিবেদিতার প্রাথমিক সংশয় ও স্বামীজীর প্রভাব দিক থেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রথম সাক্ষাতেই নিবেদিতা স্বামীজীকে তাঁর 'গুরু' হিসেবে মেনে নেননি। তিনি অত্যন্ত বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন ছিলেন এবং স্বামীজীর সব কথা শুরুতে মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু স্বামীজীর অসীম ধৈর্য এবং তাঁর সত্যনিষ্ঠা নিবেদিতাকে ক্রমশ আকর্ষণ করতে থাকে। স্বামীজী সেদিন বলেছিলেন:

"মানুষকে তাহার নিজের মুক্তির পথ নিজেকেই খুঁজিয়া নিতে হইবে।"

এই উক্তিটি নিবেদিতাকে এক অদ্ভুত স্বাধীনতা ও ভরসা দিয়েছিল। আর সেখানে প্রথম সাক্ষাতের রেশ ও উপলব্ধি করেন-

        সাক্ষাৎ শেষে নিবেদিতা যখন বাড়ি ফিরছিলেন, তখন তাঁর মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। তিনি অনুভব করেছিলেন যে, তিনি সাধারণ কোনো মানুষের সংস্পর্শে আসেননি। তাঁর মনে হয়েছিল স্বামীজী এমন একজন মানুষ যার মধ্যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যর মেলবন্ধন ঘটেছে এবং যিনি সমগ্র বিশ্বের কল্যাণের কথা ভাবছেন। নিবেদিতা এই প্রথম সাক্ষাতের প্রভাব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন:

"সেই সন্ধ্যার পর থেকে আমার মনে হতে লাগল যে, ভারতের এক মহান আত্মা আমার জীবনের দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছেন।"

          পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,'স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়েছি' গ্রন্থে বর্ণিত এই প্রথম সাক্ষাতের চিত্রটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। নিবেদিতা খুব স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, স্বামীজী কোনো জাদুমন্ত্র বা অলৌকিকতায় তাঁকে বশ করেননি। বরং স্বামীজীর চারিত্রিক মাহাত্ম্য, তাঁর প্রজ্ঞা এবং সত্যের প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠাই নিবেদিতার মনে রেখাপাত করেছিল। এই প্রথম সাক্ষাৎই ছিল এক দীর্ঘ পরিক্রমার শুরু, যার পরিণতিতে মার্গারেট নোবেল হয়ে উঠেছিলেন 'নিবেদিতা'-অর্থাৎ ভারতের জন্য নিবেদিত এক প্রাণ।

ঠিক এরূপ অসংখ্য আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট ও  SHESHER KABITA SUNDARBON YouTube Channel 🙏




Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...