Skip to main content

জীবনস্মৃতি' কি নিছক আত্মজীবনী?আলোচনা করো।

'জীবনস্মৃতি' কি নিছক আত্মজীবনী? রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর উপক্রমণিকায় বলেছেন এটি তাঁর জীবনের ইতিহাস নয়, বরং তাঁর 'স্মৃতিচিত্র'। এই মন্তব্যটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর)

           রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'জীবনস্মৃতি' গ্রন্থের প্রকৃতি বিশ্লেষণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেখানে কবি নিজেই তাঁর 'উপক্রমণিকা' অংশে স্পষ্ট করেছেন যে এটি কোনো প্রথাগত বা পারম্পরিক আত্মজীবনী নয়। আসলে এটি নিছক আত্মজীবনী বনাম স্মৃতিচিত্র গ্ৰন্থ।তবে সাধারণত আত্মজীবনী বলতে আমরা বুঝি- কোনো ব্যক্তির জন্ম থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির কালানুক্রমিক এবং তথ্যনিষ্ঠ বিবরণ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের 'জীবনস্মৃতি' সেই অর্থে তথ্যবহুল 'বায়োগ্রাফি' নয়। কবি উপক্রমণিকায় লিখেছেন-

"জীবনস্মৃতি জীবনের ইতিহাস নহে-তাহা কোনো একটি বিশেষের জীবনবৃত্তান্ত নহে।"

      রবীন্দ্রনাথের মতে, ইতিহাস গড়া হয় বাইরের ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে, কিন্তু 'জীবনস্মৃতি' রচিত হয়েছে কবির অন্তরের রঙে। তিনি বাইরের ঘটনার চেয়ে ভেতরের উপলব্ধিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে কেবল সেইটুকুই গ্রহণ করেছেন যা তাঁর কবিসত্তাকে নির্মাণ করেছে। কবি এখানে ঐতিহাসিকের মতো সত্যনিষ্ঠ হওয়ার চেয়ে শিল্পীর মতো সৌন্দর্যনিষ্ঠ হতে চেয়েছেন।তাই স্মৃতিচিত্রের ধারণা হলো পটের ওপর আলপনা। আর সেখানে-

        রবীন্দ্রনাথ 'জীবনস্মৃতি'র স্মৃতিকথাকে তুলনা করেছেন একজন চিত্রকর বা পটুয়ার আঁকা ছবির সঙ্গে। তিনি বলেছেন-

"স্মৃতির পটে জীবনের যে-সব ছবি আঁকা পড়িয়াছে তাহা সংকলন করিয়া বাহির করা হইয়াছে। ...ইহা স্মৃতির চিত্র।"

        আসলে একজন চিত্রকর যেমন পটের ওপর তুলির টানে কোনো বিশেষ দৃশ্যকে ফুটিয়ে তোলেন, রবীন্দ্রনাথও তেমনি তাঁর স্মৃতিভাণ্ডার থেকে বেছে বেছে কিছু মুহূর্তকে শব্দের তুলিতে এঁকেছেন। এখানে ঘটনা বড় নয়, সেই ঘটনার অভিঘাত কবির মনে যে ছবি এঁকেছে, সেটিই মুখ্য।তবে সেখানে-

     জীবনস্মৃতি হলো জীবনস্মৃতি বনাম প্রথাগত জীবনবৃত্তান্ত। যেখানে এই গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় কেন এটি 'নিছক আত্মজীবনী' নয়। কারণ-

         কবি জীবনের সব ঘটনা লেখেননি। শৈশবের সেই জোড়াসাঁকোর অন্দরমহল, ভৃত্যরাজক শাসন, হিমালয় যাত্রা এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ-কাদম্বরী দেবীর প্রভাব-যেগুলো তাঁর কাব্যচেতনাকে পুষ্ট করেছে, কেবল সেগুলোই স্থান পেয়েছে।তবে আত্মজীবনীতে সাধারণত 'আমি' বা অহংবোধ প্রবল থাকে। কিন্তু 'জীবনস্মৃতি'তে রবীন্দ্রনাথ নিজেকে একজন দ্রষ্টার মতো দূর থেকে দেখেছেন। তিনি তাঁর অতীত সত্তাকে এক বিশেষ রসের আধারে পরিবেশন করেছেন।এছাড়াও-

        এই আত্মজীবনী পড়ার সময় পাঠকের মনে হয় না যে তিনি কারও ব্যক্তিগত ডায়েরি পড়ছেন, বরং মনে হয় তিনি কোনো উচ্চমানের উপন্যাস বা প্রবন্ধমালা পড়ছেন, যেটি সাহিত্যিক রসময়।আর সেখানে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, মানুষের জীবন দুই প্রকার-এক যা সে প্রতিদিন যাপন করে, আর দুই যা তার অন্তরের গভীরে তিল তিল করে গড়ে ওঠে। 'জীবনস্মৃতি' হলো সেই দ্বিতীয় প্রকারের জীবনের পরিচয়। তিনি নিজেই বলেছেন-

 "ভিতরের মানুষটি যে গড়িয়া উঠিতেছে তাহারি ইতিহাসটি জানা আবশ্যক।"

        পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, 'জীবনস্মৃতি' কোনো দিনপঞ্জি বা ঘটনার তালিকা নয়। এটি কবির মানস-বিবর্তনের এক শিল্পসমৃদ্ধ আলেখ্য। তথ্যের চেয়ে সত্য এবং ঘটনার চেয়ে রসের প্রাধান্য এই গ্রন্থকে আত্মজীবনীর গণ্ডি ছাড়িয়ে সাহিত্যের এক অনন্য 'স্মৃতিচিত্র' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার নিরিখে এই উত্তরটি কবির নিজস্ব নন্দনতত্ত্বকে প্রতিফলিত করে।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...