Skip to main content

জীবনস্মৃতি গ্ৰন্থ অবলম্বনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দাও।

জীবনস্মৃতি গ্ৰন্থ অবলম্বনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দাও। (স্কুল জীবনের স্মৃতি) (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর DS11)

       আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'জীবনস্মৃতি' কেবল তাঁর জীবনের ঘটনাক্রম নয়, বরং এক সংবেদনশীল কবির বেড়ে ওঠার মনস্তাত্ত্বিক দলিল। এই গ্রন্থের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তাঁর স্কুল জীবনের স্মৃতি, যা কোনো মতেই সুখকর ছিল না।তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'জীবনস্মৃতি' পাঠ করলে বোঝা যায়, প্রথাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর কাছে ছিল এক প্রকার বন্দিশালা। তাঁর শৈশব স্মৃতির এক বড় অংশ জুড়ে রয়েছে স্কুলের প্রতি অনীহা এবং সেই যান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি চরম তিক্ততা।আর সেখানে আমরা দেখি-

        রবীন্দ্র জীবনে ঘর একটি বন্দিশালা ও স্কুলের পরিবেশ হলো আতঙ্কের স্থল।আর সেকারণে রবীন্দ্রনাথের কাছে স্কুল ছিল এক আতঙ্কের নাম। তিনি প্রথমে ওরিয়েন্টাল সেমিনারি এবং পরে নর্মাল স্কুল ও বেঙ্গল অ্যাকাডেমিতে পড়াশোনা করেন। নর্মাল স্কুলের অভিজ্ঞতায় তিনি লিখেছেন যে, স্কুলের চারদিকের দেয়াল এবং জানলার গরাদগুলি তাঁকে বন্দিত্বের কথা মনে করিয়ে দিত। তিনি স্কুলকে 'আন্দামান দ্বীপ' বা 'জেলখানা'-র সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেখানে বাইরের জগতের সঙ্গে শিশুর কোনো সংযোগ থাকে না, সেই বদ্ধ পরিবেশ তাঁর কবি-হৃদয়কে ব্যথাতুর করে তুলত।আবার -

     যান্ত্রিক শিক্ষা ও প্রাণহীন শিক্ষকের প্রতি রবীন্দ্র বিতৃষ্ণা।রবীন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেছিলেন, তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থায় ছাত্রের মনের কোনো গুরুত্ব ছিল না। শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত যান্ত্রিক। শিক্ষকেরা আসতেন কেবল নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম শেষ করতে। নর্মাল স্কুলের শিক্ষকদের রুক্ষ আচরণ এবং বেতের শাসন তাঁকে বিচলিত করত। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতায় জানিয়েছেন যে, শিক্ষকদের কাছে ছাত্ররা ছিল যেন এক-একটি আধার, যার মধ্যে জোর করে জ্ঞান ঢেলে দেওয়া হতো। এই অমানবিক ও রসকষহীন শিক্ষাদানের প্রতি তাঁর তীব্র বিতৃষ্ণা তৈরি হয়েছিল।শুধু তাই নয়-

    ভাষার বোঝা ও নিরস পাঠ্যক্রম রবীন্দ্র মানসে আঘাত হানে।যেখান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ভাষার যে কঠিন প্রাচীর ছিল, তা রবীন্দ্রনাথের কাছে অসহ্য ঠেকেছিল। বিশেষ করে ইংরেজি ও লাতিন শিক্ষার অসারতা তিনি 'জীবনস্মৃতি'-তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। বেঙ্গল অ্যাকাডেমিতে লাতিন ভাষার ব্যাকরণ মুখস্থ করার যন্ত্রণা তাঁকে কুরে কুরে খেত। তাঁর মতে, যে শিক্ষা আনন্দের নয়, যা মনের খোরাক জোগায় না, তা কখনো প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না। মুখস্থ বিদ্যার এই জয়জয়কার তাঁর সৃজনশীল সত্তাকে বাধাগ্রস্ত করত।

      সহপাঠীদের আচরণ ও বিচ্ছিন্নতাবোধ রবীন্দ্র জীবনে প্রবল আলোড়ন হানে।যেখানে স্কুলের সহপাঠীদের মধ্যেও তিনি কোনো প্রাণের পরশ পাননি। অনেক সময় সহপাঠীদের অভদ্রতা এবং শিক্ষকদের পক্ষপাতমূলক আচরণ তাঁর কোমল মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করত। টিফিনের ছুটিতে যখন অন্য ছেলেরা খেলাধুলায় মেতে থাকত, রবীন্দ্রনাথ তখন জানলার গরাদ ধরে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। প্রকৃতির প্রতি এই টান আসলে ছিল প্রাতিষ্ঠানিক খাঁচা থেকে মুক্তির এক আকুল আবেদন।যেখান থেকে রবীন্দ্র জীবনে-

     শিক্ষার অসারতা ও বিকল্প ভাবনার জন্ম নিতে শুরু করে।আসলে রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন যে, তখনকার শিক্ষা ব্যবস্থা জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। সেখানে পরীক্ষা পাসের তাগিদ আছে, কিন্তু মানুষ হওয়ার মন্ত্র নেই। 'জীবনস্মৃতি'-তে বর্ণিত এই তিক্ত অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁকে প্রথাগত স্কুল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে সাহায্য করেছিল। এই তিক্ততার ফসল হিসেবেই আমরা পরে পাই 'শান্তিনিকেতন' ও 'বিশ্বভারতী'-র মতো প্রতিষ্ঠান, যেখানে কোনো চার দেয়ালের প্রাচীর নেই, আছে প্রকৃতির অবাধ সান্নিধ্য।

         পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,রবীন্দ্রনাথের 'জীবনস্মৃতি' পাঠ করলে বোঝা যায়, তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল ব্যর্থতার এক ইতিহাস। তবে এই ব্যর্থতাই তাঁকে প্রকৃত শিক্ষার আদর্শ খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিল। তাঁর মতে, শিক্ষা হওয়া উচিত গাছের মতো স্বতঃস্ফূর্ত, লোহার কলের মতো যান্ত্রিক নয়।রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল প্রাণের স্পন্দনহীন এক কৃত্রিম ব্যবস্থা। 'জীবনস্মৃতি'-তে ফুটে ওঠা তাঁর এই তিক্ততা আসলে তৎকালীন ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই এক নীরব প্রতিবাদ।



Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...