Skip to main content

রবীন্দ্রনাথের কৈশোরের সাহিত্যচর্চায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও কাদম্বরী দেবীর ভূমিকা আলোচনা করো।

রবীন্দ্রনাথের কৈশোরের সাহিত্যচর্চায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও কাদম্বরী দেবীর ভূমিকা আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পঞ্চম সেমিস্টার, বাংলা মেজর )

           আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যিক জীবনের উন্মেষলগ্নে তাঁর পরিবারের দুই সদস্য-জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাদম্বরী দেবী-অনুঘটক হিসেবে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। একদিকে নতুনদাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সাহচর্য এবং অন্যদিকে নতুনবৌঠান কাদম্বরী দেবীর নিবিড় মমতাপূর্ণ প্রশ্রয় ও কঠোর সমালোচনা কিশোর রবিকে বিশ্বকবি হওয়ার পথে চালিত করেছিল।আর সেখানে-

১. জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর: মুক্তির কারিগর ও মেন্টর

       জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বারো বছরের বড় হলেও তাঁদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কঠোর শাসনের বাইরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথই ছিলেন রবির প্রথম মুক্ত আকাশ। যেখানে- জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যখন পিয়ানোতে নতুন নতুন সুর সৃষ্টি করতেন, কিশোর রবি তখন সেই সুরের ছাঁচে শব্দ বসাতেন। এটিই ছিল তাঁর গীতিনাট্য রচনার হাতেখড়ি। ‘জীবনস্মৃতি’-তে রবীন্দ্রনাথ স্মৃতিচারণা করেছেন-

   "জ্যোতিদাদা পিয়ানো বাজাইয়া গান তৈরি করিতে প্রবৃত্ত হইতেন... সেই সদ্যোজাত সুরগুলির উপর কথা বসাইয়া যাওয়া আমার কাজ ছিল।"

       সাহিত্যের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ঠাকুরবাড়ি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের কক্ষটি ছিল তৎকালীন ঠাকুরবাড়ির সাহিত্যচর্চার প্রাণকেন্দ্র। সেখানে কিশোর রবিকে বয়সে ছোট বলে উপেক্ষা করা হতো না। তাঁর মতামত গুরুত্ব দেওয়া হতো। এই সাহচর্যেই কবি তাঁর প্রথম জীবনের গদ্য ও কাব্যিক জড়তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন।আর সেখানে ‘ভারতী’ পত্রিকা প্রকাশে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের উদ্যোগ রবীন্দ্রনাথকে নিয়মিত লেখার তাগিদ দিত। কবির কৈশোরের কাব্যগ্রন্থ 'বনফুল' বা 'কবি কাহিনী'র পেছনে নতুনদাদার অনুপ্রেরণা ছিল অনস্বীকার্য।অপরপক্ষে আমরা দেখি-

      অনুপ্রেরণা ও প্রধান সমালোচক হিসেবে কাদম্বরী দেবীকে। আসলে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পত্নী কাদম্বরী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সমবয়সী খেলার সাথী। তাঁর প্রতি কবির টান ছিল গভীর ও শৈল্পিক। রবীন্দ্রনাথের ‘হেঁতালি’ বা রূপকধর্মী সাহিত্যচর্চার মূলে ছিলেন তিনি।যেখানে কাদম্বরী দেবী কিশোর কবির কেবল স্তুতি করতেন না, বরং বিহারীলাল চক্রবর্তীর মতো বড় কবিদের সঙ্গে রবির তুলনা করে তাঁকে আরও উন্নত হওয়ার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-

   "তিনি যদি প্রশংসা করিতেন তবে আমি বড়ো দুর্গতিতে পড়িতাম। তিনি ক্রমাগতই আমাকে এই কথা বলিতেন যে, 'রবি কোনোকালেই ভালো লিখিতে পারিবে না'।"

      আসলে এই নেতিবাচক মন্তব্যই আসলে রবিকে জেদ এবং সাধনার পথে ঠেলে দিয়েছিল।শুধু তাই নয়- নিঃসঙ্গতার সঙ্গী ছিলেন কাদম্বরীদেবী।আসলে কবির মা সারদা দেবীর মৃত্যুর পর কাদম্বরী দেবীই ছিলেন তাঁর শোকের আশ্রয়। তাঁর সান্নিধ্যেই কিশোর কবি প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সুযোগ পান। কবির ভাষায়-

   "যাহার সাহচর্যে আমার কৈশোর ও যৌবনের সন্ধিকালটি আনন্দময় হইয়াছিল, তিনি আমার জীবনের ধ্রুবতারা।"

          সাহিত্যিক প্রভাবকারী হিসেবে কাদম্বরী দেবীর প্রভাব রবীন্দ্রনাথের অজস্র রচনায় ছড়িয়ে আছে। বিশেষ করে ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ রচনার প্রেক্ষাপটে নতুনবৌঠানের সঙ্গে কবির সেই অম্লমধুর সম্পর্কের রেশ পাওয়া যায়।মোটকথা হলো-

             জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও কাদম্বরী দেবী মিলে ঠাকুরবাড়ির ছাদে যে ‘নন্দনকানন’ তৈরি করেছিলেন, সেখানেই রবীন্দ্রনাথের রবীন্দ্রত্ব অর্জনের বীজ রোপিত হয়েছিল। গঙ্গাতীরের বাগানবাড়িতে এই দুজনের সঙ্গে কাটানো দিনগুলিই রবীন্দ্রনাথকে প্রকৃতির কবি করে তোলে। গঙ্গার উপর নৌকায় বসে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বেহালা আর রবীন্দ্রনাথের গান—এই ছিল তাঁর কৈশোরের শিক্ষার প্রকৃত পাঠশালা।

         পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যদি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের দেহতত্ত্ব বা কাঠামো নির্মাণ করে থাকেন, তবে কাদম্বরী দেবী সেই সাহিত্যে প্রাণের স্পন্দন ও রস জুগিয়েছেন। ১৮৮৪ সালে কাদম্বরী দেবীর অকাল প্রয়াণ রবীন্দ্রনাথের জীবনে যে ‘হাহাকার’ এনেছিল, তা-ই পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যকে এক গভীর দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। মূলত এই দুই ব্যক্তির প্রভাবেই কিশোর রবি ‘বাল্মিকী প্রতিভা’ থেকে শুরু করে ‘সন্ধ্যাসঙ্গীত’-এর মতো কালজয়ী সৃষ্টির পথে এগিয়ে যান।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...