স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়েছি গ্রন্থে স্বামীজীর উদার ধর্মশিক্ষা সম্পর্কে লেখিকার মতামত ব্যক্ত করো পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বরে রাখি যে,ভগিনী নিবেদিতা রচিত 'স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়েছি' (The Master as I Saw Him) গ্রন্থটি স্বামী বিবেকানন্দের বহুমুখী ব্যক্তিত্ব ও দর্শনের এক অনন্য দলিল। এই গ্রন্থে স্বামীজীর উদার ধর্মশিক্ষা সম্পর্কে লেখিকার গভীর পর্যবেক্ষণ ও শ্রদ্ধাশীল মনোভাব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। স্বামীজীর ধর্মশিক্ষা কেবল কোনো বিশেষ মতবাদ বা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল সার্বজনীন মানবতার মুক্তিগাথা।যা নিবেদিতার লেখনীতে স্বামীজীর ধর্মশিক্ষার প্রধান দিকগুলি নিচে আলোচনা করা হলো-
নিবেদিতা লক্ষ্য করেছেন যে, স্বামীজীর কাছে ধর্ম কোনো তাত্ত্বিক বিতর্ক ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন পৃথিবীর সমস্ত ধর্মই সত্যের বিভিন্ন রূপ। নিবেদিতার ভাষায়-
"তিনি হিন্দুধর্মকে বিশ্বের সকল ধর্মের জননী বলিয়া মনে করিতেন, অথচ খ্রীষ্টধর্ম বা ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তাঁহার শ্রদ্ধার অন্ত ছিল না।"
ভগিনী নিবেদিতা বর্ণনা করেছেন কীভাবে স্বামীজী শ্রীরামকৃষ্ণের সেই অমোঘ বাণী-'যত্র জীব তত্র শিব' বা 'যত মত তত পথ'-কে বিশ্বজনীন রূপ দিয়েছিলেন। স্বামীজীর এই উদারতা নিবেদিতাকে মুগ্ধ করেছিল, কারণ তিনি দেখেছিলেন বিবেকানন্দ কোনো বিশেষ ধর্মের জয়গান না গেয়ে সত্যের জয়গান গাইছেন।আসলে-
স্বামীজীর ধর্মশিক্ষা ছিল মূলত 'মানুষ তৈরির' শিক্ষা। নিবেদিতা দেখিয়েছেন যে, স্বামীজী পুথিগত বিদ্যা বা শুষ্ক সন্ন্যাস অপেক্ষা মানুষের ভেতরের অন্তর্নিহিত দেবত্ব জাগিয়ে তোলাকেই প্রকৃত ধর্ম মনে করতেন। লেখিকার মতে, স্বামীজীর কাছে ধর্ম হলো এমন এক শক্তি যা মানুষকে আত্মনির্ভরশীল ও নির্ভীক করে তোলে। স্বামীজী বলতেন-
"Religion is the manifestation of the divinity already in man."
নিবেদিতা অনুভব করেছিলেন যে, স্বামীজীর এই উদার শিক্ষা কেবল হিন্দুদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য।
স্বামীজীর উদার ধর্মের অন্যতম ভিত্তি ছিল সেবা। নিবেদিতা বইটিতে উল্লেখ করেছেন যে, স্বামীজী তাঁকে শিখিয়েছিলেন দরিদ্র, আর্ত ও আর্তমানবতার সেবা করাই শ্রেষ্ঠ উপাসনা। বিবেকানন্দের ভাষায়- "বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর? জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।" নিবেদিতা অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছিলেন যে, স্বামীজী আধ্যাত্মিকতার সাথে সমাজসেবাকে একাকার করে দিয়েছিলেন। এটি কেবল উপাসনা নয়, এটি ছিল এক জীবন্ত ধর্মশিক্ষা।যেখানে
নিবেদিতা একজন পাশ্চাত্য নারী হওয়া সত্ত্বেও স্বামীজীর শিক্ষায় কোনো সংকীর্ণতা খুঁজে পাননি। বরং তিনি দেখেছেন স্বামীজী পাশ্চাত্যর বিজ্ঞান ও কর্মশক্তির সাথে প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতার এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন। স্বামীজীর উদারতার ফলেই নিবেদিতার মতো একজন বিদেশী ভারত ও ভারতের ধর্মকে আপন করে নিতে পেরেছিলেন।শুধু তাই নয়-
ভগিনী নিবেদিতার বর্ণনায় স্বামীজী ছিলেন ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পূজারী। তিনি মনে করতেন প্রত্যেকের আধ্যাত্মিক পথ আলাদা হতে পারে। কাউকে কোনো বিশেষ ছাঁচে গড়া তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। স্বামীজী চাইতেন প্রত্যেকে যেন তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের মধ্য দিয়ে সত্যের সন্ধান পায়।
পরিশেষে বলতে পারি যে, নিবেদিতার দৃষ্টিতে স্বামীজীর ধর্মশিক্ষা ছিল অত্যন্ত বিশাল, উদার এবং যুক্তিভিত্তিক। তিনি কোনো গোঁড়ামি বা কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেননি। নিবেদিতা তাঁর গ্রন্থে স্বামীজীকে এমন এক আলোকবর্তিকা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যা কেবল অন্ধকার দূর করে না, বরং মানুষের আত্মাকে জাগ্রত করে। নিবেদিতার ভাষায় স্বামীজীর ধর্মভাবনা ছিল—
"বিশ্বপ্রেমের এক মহান সংগীত, যেখানে প্রতিটি সুর স্বতন্ত্র হয়েও এক মহান ঐকতান সৃষ্টি করে।"
এই উদার ধর্মশিক্ষাই নিবেদিতাকে ভারতের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেল SHESHER KABITA SUNDARBON YouTube Channel 🙏
Comments
Post a Comment