প্রথাগত আত্মজীবনী হিসেবে 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা'র সার্থকতা ও স্বকীয়তা আলোচনা কর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর)।
শিবরাম চক্রবর্তীর 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা' গ্রন্থটি একটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস। যেখানে তিনি প্রথাগত আত্মজীবনীর কাঠামোকে ভেঙে এক স্বকীয় গদ্যশৈলী নির্মাণ করেছেন। যেটি বাংলা সাহিত্যে আত্মজীবনী বলতেই সাধারণত জীবনের ঘটনাক্রম, বংশপরিচয় এবং সাফল্যের খতিয়ান বোঝায়। কিন্তু শিবরাম চক্রবর্তীর 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা' এই প্রথাগত ছাঁচকে অস্বীকার করে এক অনন্য 'অ-জীবনী' হয়ে উঠেছে।আর সেখানে আমারা দেখি-
১. ঘটনার চেয়ে অনুভূতির প্রাধান্য
প্রথাগত আত্মজীবনীতে সাল-তারিখের গুরুত্ব থাকে অপরিসীম। কিন্তু শিবরামের কাছে সময় ছিল আপেক্ষিক। তিনি নিজের জীবনকে দেখেছেন একজন নির্লিপ্ত দর্শকের চোখে। তাঁর শৈশব, কৈশোর বা রাজনৈতিক জীবনের বর্ণনা থাকলেও সেখানে কোনো 'মহিমা' প্রচারের চেষ্টা নেই। বরং আছে একধরণের কৌতুকময় উদাসীনতা। তিনি নিজেই বলেছেন:
> "স্মৃতি মানেই তো কিছুটা বিস্মৃতি আর কিছুটা কল্পনা। আমি যা মনে রেখেছি, তা হয়তো ঘটেনি; আর যা ঘটেছে তা হয়তো মনে রাখবার মতো নয়।"
>
২. ছদ্মবেশ ও সত্যের উন্মোচন
শিবরামের এই গ্রন্থে তাঁর চিরচেনা 'হাস্যরসিক' সত্তার আড়ালে এক বিষণ্ণ মানুষের দেখা পাওয়া যায়। প্রথাগত জীবনীতে মানুষ নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে চায়, কিন্তু শিবরাম এখানে নিজের ব্যর্থতা, ভবঘুরে জীবন এবং দারিদ্র্যকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তাঁর পলায়নবৃত্তি বা বিপ্লবী জীবনের অসংলগ্নতা তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন, যা এই গ্রন্থকে সত্যনিষ্ঠ ও স্বকীয় করে তুলেছে।
৩. গদ্যরীতির অভিনবত্ব
শিবরামের গদ্য মানেই শব্দের কারসাজি (Pun)। আত্মজীবনীর মতো গম্ভীর বিষয়েও তিনি তাঁর চিরচেনা হাস্যরস বিসর্জন দেননি। তাঁর গদ্য ছোট ছোট বাক্যে বিভক্ত, চটুল এবং তীক্ষ্ণ।
> "বাঁচবার মতো বাঁচতে গেলে মরবার মতো মরতে হয় না।" —এই ধরণের বৈপরীত্যপূর্ণ উক্তি বা প্যারাডক্স তাঁর দর্শনের মূল ভিত্তি। তিনি তুচ্ছ ঘটনাকে মহৎ এবং মহৎ ঘটনাকে তুচ্ছ করে দেখানোর যে ক্ষমতা দেখিয়েছেন, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল।
>
৪. আধ্যাত্মিকতা বনাম মানবিকতা
গ্রন্থের নাম 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা' হলেও এখানে প্রথাগত ধর্মের লেশমাত্র নেই। শিবরামের ঈশ্বর কোনো নিরাকার সত্তা নয়, বরং মানুষের প্রতি মমতা। তাঁর কাছে 'পৃথিবী' মানে মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের মেসবাড়ি আর 'ভালোবাসা' মানে সাধারণ মানুষের সঙ্গ। তিনি লিখেছেন:
> "ঈশ্বরকে খুঁজতে গিয়ে আমি মানুষকে পেয়েছি। মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের বাস, আর সেই মানুষকে ভালোবাসাই শ্রেষ্ঠ আরাধনা।"
>
৫. সার্থকতা ও মূল্যায়ন
গ্রন্থটির সার্থকতা এখানেই যে, এটি পাঠককে কেবল তথ্য দেয় না, বরং জীবনকে নতুন করে দেখতে শেখায়। এটি কোনো বীরগাথা নয়, বরং এক 'বিপরীত নায়ক' (Anti-hero)-এর জবানবন্দি। শিবরাম প্রমাণ করেছেন যে, চটুল হাসির আড়ালে গভীর জীবনবোধ লুকিয়ে রাখা যায়। তাঁর একাকীত্ব, আসক্তিহীনতা এবং অকিঞ্চনতা এই আত্মজীবনীকে এক চিরকালীন আধুনিকতা দান করেছে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা' কেবল শিবরাম চক্রবর্তীর জীবনকথা নয়, এটি এক নির্মোহ জীবনদর্শন। প্রথাগত আত্মজীবনীর শৃঙ্খল ভেঙে এটি হয়ে উঠেছে এক মুক্ত মানবের মুক্ত গদ্য। ডব্লিউ.বি.এস.ইউ (WBSU) পাঠ্য হিসেবে এর গুরুত্ব অপরিসীম কারণ এটি আমাদের শেখায় কীভাবে অভাব ও একাকীত্বের মাঝেও জীবনের রস আস্বাদন করা সম্ভব।
এই উত্তরটি কি আপনার নোটের জন্য যথেষ্ট, নাকি কোনো বিশেষ অংশ (যেমন—বিপ্লবী জীবন বা মেসবাড়ির অনুষঙ্গ) আরও বিস্তারিতভাবে যোগ করতে হবে?
Comments
Post a Comment