'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা' গ্রন্থে মেসবাড়ির চালচিত্র ও শিবরামের জীবনদর্শন আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর)।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম রম্যরচনাকার শিবরাম চক্রবর্তীর আত্মজৈবনিক উপন্যাস 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা',যেটি কোনো প্রথাগত আত্মজীবনী নয়। এখানে জীবনের ধারাবাহিক ঘটনাক্রমের চেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে লেখকের নির্মোহ জীবনদর্শন। এই দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে উত্তর কলকাতার মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের সেই বিখ্যাত মেসবাড়ি। শিবরামের কাছে এই মেসবাড়ি কেবল একটি আস্তানা ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর জগত ও জীবনকে দেখার এক অনন্য দর্পণ।আর সেখানে আমারা দেখি-
•মেসবাড়ি ও নির্লিপ্তির তপোবন।শিবরামের জীবনে পারিবারিক বন্ধনের চেয়ে মেসবাড়ির জীবন ছিল অধিক প্রিয়। প্রথাগত সাংসারিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে এক চিলতে ঘরে নিজের মতো করে বাঁচার যে স্বাদ তিনি পেয়েছিলেন, তা এই গ্রন্থেই পরিস্ফুট। মেসবাড়ির সেই স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল, তক্তপোশ আর ভাঙা জানলা তাঁর কাছে ছিল রাজপ্রাসাদের চেয়েও দামি। তিনি হিমালয়ের গুহায় না গিয়েও কলকাতার মেসবাড়িতে বসে এক প্রকার সন্ন্যাস জীবন যাপন করতেন। তিনি লিখেছেন-
"মুক্তারাম বাবুর স্ট্রিটের এই মেসটাই আমার কাছে কুরুক্ষেত্র, আবার এটাই আমার কাছে তপোবন।"
দেওয়াল লিপি ও স্মৃতির কারুকার্যময় মেসবাড়ি।মেসবাড়ির ঘরটির দেওয়ালে পেনসিল দিয়ে মানুষের নাম-ঠিকানা ও ফোন নম্বর লিখে রাখা ছিল শিবরামের এক অদ্ভুত স্বভাব। কাগজ হারিয়ে যায়, কিন্তু দেওয়াল তো থাকে-এই যুক্তিতেই তিনি দেওয়ালকে ডায়েরি বানিয়েছিলেন। এই দেওয়াল লিপি তাঁর নির্লিপ্ত জীবনের প্রতীক। তিনি মনে করতেন, মানুষের আসা-যাওয়া কেবল দেওয়ালের লিখনমাত্র, সময়ের স্রোতে যা একদিন মুছে যাবে। আসলে-
গদ্যরীতি ও শব্দের খেলা শিবরাম চক্রবর্তীর সৃজনশীলতার অঙ্গ।আর সেখানে শিবরামের গদ্যরীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো স্ন্যাপশটধর্মী ছোট ছোট বাক্য এবং অবিশ্বাস্য শব্দক্রীড়া বা 'Pun'। মেসবাড়ির অভাব-অনটনকেও তিনি শব্দের জাদুতে হালকা করে দিয়েছেন। যেমন-"হাঁপানির টান আর টাকার টান দুটোর মধ্যেই কষ্ট আছে।" মেসবাড়ির সাধারণ খাওয়া-দাওয়া বা দারিদ্র্যকে তিনি যেভাবে হাস্যরসের প্রলেপে পরিবেশন করেছেন, তা তাঁর জীবনবোধের এক অনন্য দিক। এছাড়াও আছে-
হাসির আড়ালে একাকীত্ব ও মানবিকতা এবং মেসবাড়ির তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনার বর্ণনাও সাহিত্যের রসদ হয়ে উঠেছে। মেসের আবাসিকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর অথচ আসক্তিহীন। তিনি ঈশ্বরকে খুঁজেছেন মন্দিরে নয়, বরং মানুষের ভালোবাসায়। তাঁর মতে-
"পৃথিবীকে ভালোবেসেছি, ঈশ্বরকে নয়; কারণ ঈশ্বরকে দেখা যায় না, পৃথিবীকে যায়।"
মেসবাড়ির একাকীত্বকে তিনি বিষাদে নয়, বরং এক ধরণের দার্শনিক আনন্দ বা 'ডিটাচমেন্ট'-এ রূপান্তরিত করেছিলেন।
প্রথাগত জীবনীর ব্যতিক্রম ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা।সাধারণ আত্মজীবনীতে মানুষ নিজের সাফল্য প্রচার করে, কিন্তু শিবরাম এখানে নিজের ব্যর্থতা, পলায়নবৃত্তি এবং অকিঞ্চনতাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। মেসবাড়ির এই বাউন্ডুলে জীবনই তাঁকে শিখিয়েছিল যে জীবনের প্রকৃত ঐশ্বর্য বস্তুতে নয়, বরং মনের স্বাধীনতায়।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা' গ্রন্থে মেসবাড়ি কেবল একটি স্থান নয়, এটি এক জীবনবোধের প্রতীক। শিবরাম চক্রবর্তী প্রমাণ করেছেন যে, চটুল হাসির আড়ালে গভীর জীবনদর্শন লুকিয়ে রাখা যায়। মেসবাড়ির অনুষঙ্গে তাঁর এই গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যে এক ব্যতিক্রমী এবং আধুনিক 'আধ্যাত্মিক' জীবনের দলিল হয়ে উঠেছে।
Comments
Post a Comment