স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়েছি গ্রন্থের পঞ্চম পরিচ্ছদে উত্তর ভারতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনা প্রসঙ্গে স্বামীজীর যে গভীর স্বদেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায় তা নিজের ভাষায় লেখো।
স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়েছি গ্রন্থের পঞ্চম পরিচ্ছদে উত্তর ভারতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনা প্রসঙ্গে স্বামীজীর যে গভীর স্বদেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায় তা নিজের ভাষায় লেখো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পঞ্চম সেমিস্টার,বা়ংলা মেজর)।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ভগিনী নিবেদিতা রচিত 'স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়েছি' (The Master as I Saw Him) গ্রন্থের পঞ্চম পরিচ্ছেদটি স্বামীজীর ভারত-ভ্রমণ এবং তাঁর অন্তরের গভীর দেশপ্রেমের এক অনন্য দলিল। এই পরিচ্ছেদে উত্তর ভারতের হিমালয় সানুদেশ এবং পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পটভূমিতে স্বামীজীর যে রূপটি ফুটে উঠেছে, তা কেবল একজন পর্যটকের নয়, বরং এক দেশপ্রেমিক সন্ন্যাসীর।আর নিবেদিতার বর্ণনায় উত্তর ভারতের প্রকৃতি ও স্বামীজীর স্বদেশপ্রেমের স্বরূপটি হলো-
প্রকৃতির মাঝে স্বদেশ দর্শন স্বামীজীর।উত্তর ভারতের তুষারশুভ্র হিমালয়, পাইন বন এবং পাহাড়ি ঝরনার সৌন্দর্যে স্বামীজী যখন বিভোর হতেন, তখন তাঁর চোখে সেই সৌন্দর্য কেবল জড় প্রকৃতি ছিল না; তা ছিল তাঁর আরাধ্যা 'ভারতজননী'র এক জীবন্ত রূপ। নিবেদিতা লক্ষ্য করেছেন, স্বামীজীর কাছে ভারতের মাটি, জল, বায়ু সবই ছিল পবিত্র। উত্তর ভারতের পার্বত্য পথে ভ্রমণকালে স্বামীজী বারবার ভারতের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা স্মরণ করতেন। নিবেদিতার ভাষায়-
"তাঁহার নিকট ভারতভূমি কেবল একটি ভূখণ্ড ছিল না, তাহা ছিল এক জীবন্ত সত্তা।"
হিমালয় ও আধ্যাত্মিক স্বদেশপ্রেমে পঞ্চম পরিচ্ছেদে দেখা যায়, হিমালয়ের গম্ভীর স্তব্ধতা স্বামীজীকে গভীর ধ্যানে মগ্ন করত। কিন্তু সেই ধ্যানের মাঝেও তিনি ভারতের সাধারণ মানুষের কথা ভুলতেন না। নিবেদিতা বর্ণনা করেছেন যে, হিমালয়ের শিখর দেখে স্বামীজী যেমন শিবের মহিমা অনুভব করতেন, তেমনি আবার ভারতের দারিদ্র্য ও অশিক্ষা দূর করার সংকল্প নিতেন। নিবেদিতা লক্ষ্য করেছিলেন, স্বামীজীর আধ্যাত্মিকতা এবং দেশপ্রেম একে অপরের পরিপূরক ছিল।তবে সেখানে ছিল-
সাধারণ মানুষের প্রতি মমতা।উত্তর ভারতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি স্বামীজী সেখানকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার প্রতি নিবেদিতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। পাহাড়ি অঞ্চলের সরল মানুষ, তাদের সংস্কৃতি এবং কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে স্বামীজী ভারতের প্রকৃত আত্মাকে চিনিয়ে দিতেন। নিবেদিতা লিখেছেন-
"তিনি আমাদিগকে শিখাইতেছিলেন কীভাবে ভারতের ধূলিকণাকে ভালোবাসিতে হয়।"
আসলে স্বামীজী বিশ্বাস করতেন যে, ভারতের এই প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য তখনই সার্থক হবে, যখন ভারতের মানুষ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
উত্তর ভারতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণের সময় স্বামীজী ভারতের প্রাচীন শৌর্য ও বীরত্বের কাহিনী বর্ণনা করতেন। আর সেই বন্যার মধ্যে আছে ইতিহাসের স্মৃতিচারণ ও গর্ব। প্রাকৃতিক দৃশ্যের অন্তরালে তিনি ভারতের লুপ্ত গৌরবকে খুঁজে পেতেন। নিবেদিতার কাছে স্বামীজীর এই বর্ণনা ছিল এক নতুন ইতিহাস পাঠের মতো। স্বামীজী বলতেন, ভারতের এই পর্বতমালা কেবল পাথর নয়, এগুলি হলো ঋষিদের তপস্যার সাক্ষী। তাঁর এই গভীর অনুরাগ নিবেদিতাকে ভারতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তুলেছিল।আর সেখানে-
ভগিনী নিবেদিতা লক্ষ্য করেছেন যে, স্বামীজীর স্বদেশপ্রেম কোনো সংকীর্ণ রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ ছিল না। এটি ছিল মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। উত্তর ভারতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে স্বামীজী বারবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেন। আর সেখানে নিবেদিতাকে বলতে শুনি-
"ভারতবর্ষই ছিল তাঁহার হৃদস্পন্দন, ভারতের প্রতিটি ধূলিকণা ছিল তাঁহার নিকট স্বর্গাদপি গরীয়সী।"
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, 'স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়েছি' গ্রন্থের পঞ্চম পরিচ্ছেদে উত্তর ভারতের প্রকৃতি কেবল একটি পটভূমি মাত্র। আসল বিষয়টি হলো সেই প্রকৃতির দর্পণে স্বামীজীর 'ভারত-হৃদয়'-কে চিনে নেওয়া। নিবেদিতা অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন যে, স্বামীজীর কাছে দেশপ্রেম মানে কেবল মানচিত্র নয়, দেশপ্রেম মানে হলো দেশের মাটি ও মানুষকে দেবতার মতো পূজা করা। উত্তর ভারতের সেই ভ্রমণ নিবেদিতার চোখে স্বামীজীকে একজন বিশ্ববিজেতা সন্ন্যাসীর পাশাপাশি একজন পরম দেশপ্রেমিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDARBON YouTube channel ❤️SAMARESH Sir
Comments
Post a Comment