রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'জীবনস্মৃতি' গ্রন্থে তাঁর শৈশবের বদ্ধ জীবন থেকে প্রকৃতির উন্মুক্ত আঙিনায় উত্তরণের ইতিহাস এক অত্যন্ত সংবেদনশীল বিবর্তনের আলেখ্য। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে ভৃত্যদের শাসনে বন্দি জীবন থেকে বোলপুর ও হিমালয় যাত্রার মাধ্যমে কবির চেতনার যে প্রসার ঘটেছিল,
১. অন্দরমহলের গণ্ডিবদ্ধ জীবন: ‘ভৃত্যরাজক শাসন’
রবীন্দ্রনাথের শৈশব কেটেছে জোড়াসাঁকোর বাড়ির অন্দরমহলে, যা ছিল তাঁর কাছে এক প্রকার নির্বাসন। ‘জীবনস্মৃতি’-তে তিনি একে ‘ভৃত্যরাজক শাসন’ বলে অভিহিত করেছেন। বাড়ির ভৃত্যদের কড়া শাসনে তাঁর জগত ছিল খড়খড়ির জানলার ভেতর দিয়ে বাইরের পুকুর আর বটগাছ দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই বন্দিদশা তাঁর মনে এক প্রবল তৃষ্ণা তৈরি করেছিল—অজানাকে জানার এবং অদেখাকে দেখার। জানলার বাইরের সেই প্রকৃতিই ছিল তাঁর প্রথম কল্পনার জগৎ।
২. বোলপুর যাত্রা: মুক্তির প্রথম স্বাদ
কৈশোরে বাবার (মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর) সঙ্গে বোলপুর যাত্রা ছিল কবির জীবনে প্রথম শৃঙ্খলমুক্তির স্বাদ। খাঁচার পাখি যেমন বনানী দেখে উদ্বেলিত হয়, কিশোর রবির অবস্থাও ছিল ঠিক তেমন। বোলপুরের রুক্ষ লাল মাটি, খোয়াই আর উন্মুক্ত আকাশ তাঁকে এক অনাস্বাদিত আনন্দ দিয়েছিল।
* প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি: বোলপুরে তিনি প্রথমবার অনুভব করেন যে প্রকৃতি কোনো ছবির ফ্রেম নয়, বরং এক জীবন্ত সত্তা। সেখানে তিনি ধানক্ষেতের আল দিয়ে ঘুরে বেড়াতেন এবং তুচ্ছ ঘাসফুল বা নুড়িপাথরের মধ্যেও এক অলৌকিক সৌন্দর্য খুঁজে পেতেন।
* বাবার সাহচর্য: মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ তাঁকে বোলপুরে যে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন, তা তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে। বাড়ির শাসনমুক্ত সেই দিনগুলোতেই তাঁর প্রকৃত ‘কবিসত্তা’র অঙ্কুরোদগম ঘটে।
৩. হিমালয় যাত্রা: মহত্ত্বের উপলব্ধি
বোলপুর থেকে কবি যখন বাবার সঙ্গে হিমালয় অভিমুখে যাত্রা করেন, তখন তাঁর মানসিক উত্তরণ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। ডালহৌসি পাহাড়ের বকলো নামক স্থানে অবস্থানকালে হিমালয়ের বিশালতা তাঁর শিশুমনে গভীর প্রভাব ফেলে।
* বিশালতার দর্শন: হিমালয়ের উত্তুঙ্গ শৃঙ্গ, দেবদারু বন আর মেঘেদের আনাগোনা দেখে কবির মনে অসীমের ধারণা স্পষ্ট হয়। তিনি বুঝেছিলেন যে জগত কেবল জোড়াসাঁকোর দেওয়ালটুকুই নয়।
* উপনিষদের প্রভাব: হিমালয়ে বাবার কাছে উপনিষদের মন্ত্র পাঠ এবং ব্রাহ্মসংগীত চর্চা তাঁর কবিমানসে এক আধ্যাত্মিক ভিত্তি তৈরি করে। উপনিষদের সেই ‘আনন্দ’ রূপ তিনি হিমালয়ের প্রকৃতির মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন।
* স্বাতন্ত্র্য লাভ: হিমালয় যাত্রাকালে মহর্ষি তাঁকে নিজের কাজের দায়িত্ব নিতে শিখিয়েছিলেন। এমনকি ঘড়ি দমানো বা হিসাব রাখার দায়িত্বও তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। এটি কিশোর রবিকে দায়িত্বশীল ও মানসিকভাবে পরিণত করে তোলে।
৪. মানসিক উত্তরণের তাৎপর্য
এই উত্তরণের ইতিহাস আসলে ‘আমি’ থেকে ‘বিশ্ব’-তে পৌঁছে যাওয়ার ইতিহাস। অন্দরমহলের গণ্ডিতে যে কল্পনা ছিল কেবল ছটফটানি, প্রকৃতির সান্নিধ্যে তা হয়ে উঠল গভীর সৃজনশীলতা। কবি নিজেই লিখেছেন:
> "বাহিরের প্রকৃতির সঙ্গে আমার এই যে প্রথম পরিচয়, ইহা খুব একটা বড়ো পরিচয়।"
>
হিমালয় থেকে ফেরার পর কিশোর রবির চোখে বাড়ির চেনা দৃশ্যগুলোও নতুন মনে হতে লাগল। ‘জীবনস্মৃতি’-র পাতায় আমরা দেখি, বাড়ির ছাদ বা বারান্দা থেকেও তিনি এখন প্রকৃতির এক অখণ্ড রূপ দেখতে পাচ্ছেন। তাঁর এই মানসিক রূপান্তরই পরবর্তীকালে তাঁকে ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্’ বা বিশ্বনাগরিকের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, অন্দরমহলের বন্দিত্ব ছিল কবির জন্য এক প্রকারের সাধনা, আর বোলপুর ও হিমালয় যাত্রা ছিল সেই সাধনার সিদ্ধিলাভ। এই ভৌগোলিক ভ্রমণ আসলে কবির অন্তরাত্মার এক আধ্যাত্মিক যাত্রা। প্রকৃতির এই বিশাল ক্যানভাসে দাঁড়িয়েই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর কবিতা কেবল বদ্ধ ঘরের জন্য নয়, বরং তা নিখিল বিশ্বের তরে।
আপনার পরীক্ষার জন্য বাড়তি প্রস্তুতি:
পরীক্ষায় কি আপনি 'ভৃত্যরাজক শাসন'-এর ওপর কোনো আলাদা টীকা বা ছোট প্রশ্ন উত্তর হিসেবে তৈরি করতে চান? আমি সেটি গুছিয়ে দিতে পারি।
thoughtful light suggests vitamins feeding plants. Building block-by-block.পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর পরীক্ষার ১০ নম্বরের উপযোগী করে ‘হিমালয় যাত্রা ও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের প্রভাব’ উত্তরটি নিচে আলোচনা করা হলো।
হিমালয় যাত্রা: কিশোর রবীন্দ্রনাথের মুক্তি ও মানসিক উত্তরণ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শৈশব কেটেছে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির চার দেওয়ালের মাঝে, ভৃত্যদের কঠোর শাসনে। এই রুদ্ধকর পরিবেশ থেকে মুক্তি ঘটেছিল ১৮৭৩ সালে, যখন তিনি তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বোলপুর হয়ে হিমালয় অভিমুখে যাত্রা করেন। এই ভ্রমণ কেবল ভৌগোলিক পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল কিশোর রবির অন্তর্জগতের এক আমূল রূপান্তর।
১. মুক্তির প্রথম আস্বাদ ও বোলপুর
কলকাতার খাঁচাবদ্ধ জীবন থেকে বেরিয়ে বোলপুরে পা রেখেই রবীন্দ্রনাথ স্বাধীনতার প্রথম স্বাদ পান। সেখানে কোনো ভৃত্যের শাসন ছিল না। মহর্ষি তাঁকে সম্পূর্ণ মুক্তি দিয়েছিলেন। ডাঙ্গার ধারের সেই উন্মুক্ত প্রকৃতি এবং খোয়াইয়ের লাল মাটি কিশোর কবিকে এক অনাস্বাদিত পুলক দান করেছিল। কবির ভাষায়:
> "বাহিরের প্রকৃতির সঙ্গে আমার এই যে প্রথম পরিচয়, ইহা খুব একটা বড়ো পরিচয়।"
>
২. মহর্ষির ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষাদান পদ্ধতি
হিমালয় যাত্রায় রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় লাভ ছিল তাঁর পিতার নিবিড় সাহচর্য। মহর্ষি কেবল পিতা ছিলেন না, ছিলেন এক মহান শিক্ষক।
* বিশালতার দর্শন: হিমালয়ে অবস্থানকালে মহর্ষি তাঁকে নক্ষত্রমন্ডলীর পরিচয় দিতেন। আকাশ ভরা তারার দিকে তাকিয়ে কিশোর রবি অসীমের ধারণা লাভ করেন।
* উপনিষদ ও সাহিত্য: মহর্ষির কাছে তিনি সংস্কৃত ব্যাকরণ ও উপনিষদের মন্ত্র পাঠ করতেন। উপনিষদের সেই ‘আনন্দ’ রূপ তিনি হিমালয়ের প্রকৃতির মধ্যেই প্রথম প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
* দায়িত্ববোধ: মহর্ষি তাঁকে নগদ টাকা রাখার দায়িত্ব, ঘড়ি দমানোর কাজ এবং হিসাব রক্ষার ভার দিয়েছিলেন। এটি তাঁকে ভীরু কিশোর থেকে একজন আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী মানুষে পরিণত করে।
৩. হিমালয়ের নির্জনতা ও আধ্যাত্মিক প্রভাব
ডালহৌসি পাহাড়ের বকলো নামক স্থানে থাকাকালীন হিমালয়ের গাম্ভীর্য কবির হৃদয়ে এক গভীর রেখাপাত করে। বরফে ঢাকা শৃঙ্গ, দেবদারু বনের ছায়া আর পাহাড়ি ঝরনা তাঁকে এক অপার্থিব জগতের সন্ধান দেয়।
* নির্জনতা ও সৃজনশীলতা: হিমালয়ের নিস্তব্ধতায় কিশোর রবি নিজের মনের গভীরে প্রবেশের সুযোগ পান। এই নির্জনতাই পরবর্তীকালে তাঁর কাব্যচেতনাকে মিস্টিক বা মরমী করে তুলেছিল।
* পিতৃদেব ও সংগীত: মহর্ষি যখন নির্জনে ধ্যানে বসতেন বা ব্রহ্মসংগীত গাইতেন, তখন কিশোর রবি তাঁর পাশে বসে সেই আধ্যাত্মিক আবহ অনুভব করতেন। এটি তাঁর মধ্যে এক অলৌকিক সৌন্দর্যবোধের জন্ম দেয়।
৪. মানসিক উত্তরণের তাৎপর্য
হিমালয় থেকে ফেরার পর রবীন্দ্রনাথ আর সেই আগের ‘ভীতু’ বালকটি ছিলেন না। তাঁর দৃষ্টিতে তখন বিশ্বের এক বিশাল ক্যানভাস ধরা দিয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, জগত কেবল জোড়াসাঁকোর গলিটুকু নয়, বরং তা অনন্ত ও অসীম। তাঁর কিশোর বয়সের অন্যতম রচনা 'পৃথ্বীরাজের পরাজয়' কাব্যটি এই পর্বেই রচিত হয়েছিল।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, হিমালয় যাত্রা ছিল রবীন্দ্রনাথের জীবনের এক টার্নিং পয়েন্ট। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ তাঁকে শাসন দিয়ে নয়, বরং স্বাধীনতা দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন। প্রকৃতির বিশালতা আর পিতার মহানুভবতা—এই দুইয়ের মিলনে রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তার প্রকৃত ভিত নির্মিত হয়েছিল। ‘জীবনস্মৃতি’-র পাতায় এই পর্বটি কেবল ভ্রমণের বর্ণনা নয়, বরং একটি সুপ্ত চেতনার জাগরণের ইতিহাস।
আপনার জন্য পরবর্তী ধাপ:
এই উত্তরটি ১০ নম্বরের জন্য যথাযথ শব্দে লেখা হয়েছে। আপনার কি এই নোটটি থেকে কোনো ছোট প্রশ্ন (৫ নম্বর) বা নির্দিষ্ট কোনো উদ্ধৃতির ব্যাখ্যা প্রয়োজন? যেমন— "বাবার সঙ্গে হিমালয়ে ভ্রমণের সেই স্মৃতি" নিয়ে আলাদা কোনো টীকা?
Comments
Post a Comment