Skip to main content

জীবনস্মৃতি' অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথের শৈশবে ভৃত্যদের অনুশাসনের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো ।

জীবনস্মৃতি' অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথের শৈশবে ভৃত্যদের অনুশাসনের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর DS11

       আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ জীবনস্মৃতি-তে শৈশব জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা স্মৃতিচারণ করেছেন। আসলে তিনি কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অভিজাত পরিবেশে বেড়ে উঠলেও তাঁর শৈশব ছিল ভৃত্যদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও শাসনের মধ্যে আবদ্ধ। এই অনুশাসনের ফলে তাঁর শৈশবজীবনে স্বাধীনতার অভাব, ভয়ভীতি এবং মানসিক একাকিত্বের চিত্র ফুটে ওঠে।আসলে-

          রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শৈশব ছিল ভৃত্যদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ। ভৃত্যদের অনুশাসন, শাসনপ্রণালী ও তাদের কঠোর আচরণ শিশুমনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।আর সেখানে আমারা দেখি- 

        বাইরে খেলাধুলা বা অবাধভাবে প্রকৃতির সংস্পর্শে যাওয়ার সুযোগ কম ছিল।ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ জীবনযাপন করতে হতো।শৈশব অনেকটা বন্দিজীবনের মতো মনে হতো।ভৃত্যদের আচরণে মাতৃসুলভ স্নেহের পরিবর্তে কর্তৃত্ব বেশি ছিল।শিশুদের প্রতি তাদের ব্যবহার ছিল যান্ত্রিক ও নিয়মনিষ্ঠ।প্রভু–ভৃত্যের দূরত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকত।

     •শৈশবে ভৃত্যদের অনুশাসনের চিত্র ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও শাসনব্যবস্থা।ঠাকুরবাড়ির শিশুদের দেখাশোনার দায়িত্ব ছিল ভৃত্যদের উপর। তারা অত্যন্ত কঠোরভাবে শিশুদের নিয়ন্ত্রণ করত। কোথায় যাবে, কী করবে, কীভাবে চলবে—সবকিছুই ভৃত্যদের নির্দেশে পরিচালিত হতো। ফলে শিশুর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা প্রায় ছিল না। ছিল -

           শৈশবের কঠোর নিয়ন্ত্রণ তাঁর সংবেদনশীল ও আত্মমগ্ন স্বভাব গঠনে ভূমিকা রাখে।মানবজীবন ও স্বাধীনতার মূল্য সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি জন্মায়।পরবর্তী সাহিত্যকর্মে শৈশবের এই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা যায়।

     ভয়ভীতির মাধ্যমে শাসন। যেখানে ভৃত্যরা শিশুদের বাধ্য রাখতে ভয় দেখাত এবং কঠোর ভাষা ব্যবহার করত। তাদের আচরণে এমন এক ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হতো, যা শিশুমনে আতঙ্ক ও সংকোচের জন্ম দিত। রবীন্দ্রনাথ নিজেও তাদের ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকতেন।আর সেই কারণেই আমরা দেখতে পাই-

     •স্বাধীনতা ও স্বাভাবিক শৈশবের অভাবের ফলে সাধারণ শিশুদের মতো অবাধ খেলাধুলা বা বাইরে যাওয়ার সুযোগ রবীন্দ্রনাথের ছিল না। ভৃত্যদের কড়া নজরদারির কারণে তিনি ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতেন। ফলে তাঁর শৈশব ছিল অনেকটা বন্দিজীবনের মতো। যেখানে স্নেহের পরিবর্তে কর্তৃত্বের প্রাধান্য মুখ্য হয়ে ওঠে। তাই ভৃত্যদের আচরণে মাতৃসুলভ স্নেহ বা কোমলতা কম ছিল; বরং কর্তৃত্ব ও নিয়মশৃঙ্খলাই প্রধান ছিল। শিশুদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল প্রভু–ভৃত্যের দূরত্বপূর্ণ সম্পর্ক, যেখানে ভালোবাসার চেয়ে শাসন বেশি দেখা যায়।যে কারণে রবি ঠাকুরের মনে দেখা যায়-

     •একাকিত্ব ও মানসিক প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন।এই কঠোর অনুশাসনের ফলে রবীন্দ্রনাথের মনে এক ধরনের একাকিত্ববোধ জন্মায়। বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি নিজের অন্তর্জগতে আশ্রয় নেন। এই পরিস্থিতি তাঁর কল্পনাশক্তি ও চিন্তাশক্তির বিকাশে সাহায্য করে। যেখানে-

         ভৃত্যদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ রবীন্দ্রনাথের মধ্যে আত্মমগ্নতা, সংবেদনশীলতা এবং গভীর চিন্তাশীলতার বিকাশ ঘটায়। শৈশবের এই অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্য ও জীবনদর্শনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। যারফলে রবি ঠাকুরের মনে কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটে। সেখানে আমারা দেখি- একাকিত্বের কারণে তিনি নিজের অন্তর্জগতে আশ্রয় নেন।চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটে।এই অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভা গঠনে সহায়ক হয়।

           পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,জীবনস্মৃতি থেকে জানতে পারি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শৈশব ভৃত্যদের কঠোর শাসন ও নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ ছিল। ভয়ভীতি, স্বাধীনতার অভাব এবং একাকিত্ব তাঁর শৈশবকে সীমাবদ্ধ করলেও এই অভিজ্ঞতাই তাঁর কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশে সহায়ক হয়। তাই ভৃত্যদের অনুশাসন তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...