Skip to main content

স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি’ গ্ৰন্থে স্বামীজীর মহাপ্রস্থান সম্পর্কে ভগিনী নিবেদিতার আবেগঘন অভিমত আলোচনা করো।

 ‘স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি’ গ্ৰন্থে স্বামীজীর মহাপ্রস্থান সম্পর্কে ভগিনী নিবেদিতার আবেগঘন অভিমত আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর)।

        আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে, স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি গ্রন্থটি স্বামীজীর জীবনের শেষ দিনগুলোর এক অনন্য এবং আবেগঘন দলিল। এই গ্রন্থে নিবেদিতা অতি কাছ থেকে দেখা স্বামীজীর সেই শান্ত, ধীর অথচ এক অলৌকিক মহাপ্রস্থানের প্রস্তুতির বিবরণ দিয়েছেন।আর সেখানে নিবেদিতার বর্ণনায় স্বামীজীর মহাপ্রস্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল এক সুপরিকল্পিত ও সচেতন ত্যাগ। নিম্নে গ্রন্থের আলোকে সেই প্রসঙ্গের মূল দিকগুলি আলোচনা করা হলো-

            ভগিনী নিবেদিতা লক্ষ্য করেছিলেন, জীবনের শেষ কয়েক মাস স্বামীজী ক্রমশ নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছিলেন। তাঁর মধ্যে এক গভীর প্রশান্তি বিরাজ করছিল। তিনি বারবার বলতেন, তাঁর কাজ শেষ হয়েছে এবং এখন তিনি বিশ্রাম চান। নিবেদিতা লিখেছেন, স্বামীজী যেন এক অদ্ভুত 'মুক্তি'র স্বাদ পাচ্ছিলেন। তিনি যেন জগতের সমস্ত দায়িত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করে কেবল ধ্যানে মগ্ন থাকতে চেয়েছিলেন। সেখানে শেষ দিনটির দিনলিপি (৪ঠা জুলাই, ১৯০২)।

           নিবেদিতা স্বামীজীর শেষ দিনটির যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। ১৯০২ সালের ৪ঠা জুলাই দিনটি ছিল অতি সাধারণ, অথচ আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ।ঐদিন ভোরে স্বামীজী দীর্ঘক্ষণ ধ্যান করেন। তিনি একাকী গঙ্গার তীরে পায়চারি করছিলেন এবং এক মহান গম্ভীরতায় আচ্ছন্ন ছিলেন।শুধু তাই নয়,দুপুরে তিনি মঠের সন্ন্যাসীদের সঙ্গে বসে আহার করেন, যা তিনি সচরাচর করতেন না। নিবেদিতা উল্লেখ করেছেন যে, সেই দিন স্বামীজী অদ্ভুত প্রফুল্ল ছিলেন।আর সেইদিনে-

         বিকেলের দিকে তিনি ব্রহ্মচারীদের ব্যাকরণ পড়ান। নিবেদিতা অনুভব করেছিলেন, স্বামীজী যেন তাঁর শেষ সঞ্চিত জ্ঞানটুকু উত্তরসূরিদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে চাইছিলেন।আর সেখানে সেইদিনেই-

       সন্ধ্যার পর স্বামীজী তাঁর ঘরে চলে যান এবং জপ করতে বসেন। নিবেদিতার বর্ণনা অনুযায়ী, স্বামীজী পূর্বঘোষণা অনুযায়ীই মহাসমাধি লাভ করেন। তাঁর দেহত্যাগের ভঙ্গি ছিল যোগীর মতো। নিবেদিতা লিখেছেন যে, স্বামীজী বলতেন— "এই শরীরটা যেন একটা জীর্ণ বস্ত্রের মতো ফেলে দেওয়া যায়।" ঠিক সেইভাবেই তিনি অতি শান্তিতে দেহত্যাগ করেন।আসলে-

         নিবেদিতা এই গ্রন্থে স্বামীজীর প্রয়াণকে মৃত্যু হিসেবে দেখেননি, বরং একে এক 'মহাজাগরণ' হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তিনি অনুভব করেছিলেন যে, স্বামীজী দেহত্যাগ করলেও তাঁর আদর্শ এবং শক্তি চিরকাল বিদ্যমান থাকবে। স্বামীজীর মহাপ্রস্থানের পর নিবেদিতা যখন তাঁর নশ্বর দেহের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তাঁর মনে হয়েছিল ভারতমাতা যেন তাঁর শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হারিয়েছেন, কিন্তু বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এক নতুন আলোকবর্তিকা পেয়েছে।

        পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,‘স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি’ গ্রন্থে নিবেদিতা দেখিয়েছেন যে, স্বামীজীর প্রয়াণ ছিল তাঁর ইচ্ছামৃত্যুর মতো। তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেমন ছিল বীরত্বে পূর্ণ, তাঁর বিদায়বেলাও ছিল তেমনই মহান এবং প্রশান্ত। নিবেদিতার কলমে স্বামীজীর মহাপ্রস্থান এক বিষাদময় বিচ্ছেদ নয়, বরং এক আধ্যাত্মিক উত্তরণ হিসেবে ধরা দিয়েছে।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...