Skip to main content

জীবনস্মৃতি গ্ৰন্থ অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বাজাত্যবোধ ও হিন্দুমেলা।রবীন্দ্রনাথের কিশোর বয়সে হিন্দুমেলা এবং নবগোপাল মিত্রের সাহচর্যে তাঁর মনে যে দেশাত্মবোধের জাগরণ ঘটেছিল, তার বর্ণনা দাও (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর DS11 )।

        আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'জীবনস্মৃতি' কেবল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের আলেখ্য নয়, বরং তৎকালীন বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের এক দর্পণ। এই গ্রন্থের 'স্বদেশী সমাজ' ও 'হিন্দুমেলার' স্মৃতিচারণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তাঁর কিশোর মনে দেশপ্রেমের বীজ বপন করেছিল ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল এবং নবগোপাল মিত্রের উদ্দীপনা।আসলে তাঁর কিশোর বয়সে দেশপ্রেমের উন্মেষ কোনো তাত্ত্বিক শিক্ষা থেকে হয়নি, বরং তা ছিল এক জীবন্ত পরিবেশের প্রভাব। বিশেষ করে হিন্দুমেলা এবং নবগোপাল মিত্রের সাহচর্য তাঁর কিশোর মনে স্বাজাত্যবোধের বীজ বপন করেছিল।আর সেখানে আমরা দেখি-

        রবীন্দ্র জীবনে পারিবারিক পটভূমি ও স্বদেশী আবহ।রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন যে, তাঁদের পরিবারে স্বাজাত্যবোধের চর্চা কোনো কৃত্রিম আড়ম্বর ছিল না, তা ছিল প্রাত্যহিক জীবনের অংশ। যখন চারিদিকে ইংরেজি আদব-কায়দার জয়জয়কার, তখন ঠাকুরবাড়িতে বাংলা ভাষা, দেশি পোশাক এবং দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা হতো। এই পরিবেশই কিশোর রবির মনে প্রথম 'স্বদেশ' চেতনার ভিত্তি গড়ে দেয়।আর সেখানে আমরা দেখি- 

        হিন্দুমেলা ও কিশোর রবীন্দ্রনাথকে।১৮৬৭ সালে নবগোপাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু এবং গণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে 'হিন্দুমেলা' (যা 'চৈত্রমেলা' নামেও পরিচিত ছিল) সূচিত হয়। এই মেলা ছিল বাঙালির জাতীয়তাবোধ জাগরণের প্রথম সার্থক মঞ্চ।আর সেখানে মেলার উদ্দেশ্য ছিল বিলিতি পণ্যের মোহ ত্যাগ করে দেশীয় শিল্প ও কৃষিপণ্যের প্রসার ঘটানো এবং জাতির লুপ্ত গৌরব পুনরুদ্ধার করা।যেখানে-

          কিশোর রবির ভূমিকা ছিল ছোখে পড়ার মতো।১৮৭৫ সালে মাত্র ১৪-১৫ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ এই মেলায় তাঁর নিজের লেখা 'হিন্দুমেলা ও উপহার' কবিতাটি পাঠ করেন। লর্ড কার্জনের দিল্লি দরবারের জাঁকজমকের বিপরীতে এই মেলা ছিল নিঃস্ব দেশবাসীর মিলনক্ষেত্র। 'জীবনস্মৃতি'তে তিনি স্মরণ করেছেন যে, সেখানে দেশাত্মবোধক গান ও কবিতার মাধ্যমে কীভাবে যুবকদের মনে আগুনের সঞ্চার করা হতো।যারফলে-'

     ন্যাশনাল' নবগোপাল মিত্রের প্রভাব পড়ে রবীন্দ্র জীবনে।রবীন্দ্রনাথের জীবনে নবগোপাল মিত্র ছিলেন এক বর্ণময় চরিত্র। নবগোপাল মিত্রের সবকিছুর সঙ্গেই 'ন্যাশনাল' শব্দটি যুক্ত ছিল, যা রবীন্দ্রনাথকে কৌতুকমিশ্রিত শ্রদ্ধা জাগাত।

 * শারীরিক শক্তি ও দেশপ্রেম: নবগোপাল বিশ্বাস করতেন পরাধীন জাতির জন্য কুস্তি এবং লাঠিখেলা একান্ত প্রয়োজন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত জিমনেসিয়ামে কিশোর রবীন্দ্রনাথকেও যেতে হতো।

 * সাহচর্য: নবগোপালের অদম্য জেদ এবং দেশের জন্য কিছু করার আকুলতা রবীন্দ্রনাথের কিশোর মনের কল্পনাকে উদ্বেলিত করেছিল। নবগোপালের সেই 'ন্যাশনাল' ভাবনাই রবীন্দ্রমানসে জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক ধারণা স্পষ্ট করে।

৪. সঞ্জীবনী সভা ও গুপ্তচরবৃত্তি

'জীবনস্মৃতি'র একটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর অংশ হলো 'সঞ্জীবনী সভা'। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে একটি পোড়ো বাড়িতে এই গুপ্তসভা বসত। নবগোপাল মিত্রও সেখানে সক্রিয় ছিলেন। এই সভার সদস্যরা দেশি দেশলাই তৈরির চেষ্টা করতেন বা বিলিতি নুন বর্জনের শপথ নিতেন। যদিও রবীন্দ্রনাথ পরিণত বয়সে এই সভার অপরিপক্কতা নিয়ে কৌতুক করেছেন, কিন্তু কিশোর বয়সে এই 'সিক্রেট সোসাইটি'র সদস্য হওয়া তাঁর মনে স্বদেশের প্রতি এক গভীর আবেগ ও দায়বদ্ধতা তৈরি করেছিল।

৫. উপসংহার

রবীন্দ্রনাথের স্বাজাত্যবোধ ছিল অন্তরের গভীর থেকে আসা এক বোধ। 'জীবনস্মৃতি' পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, হিন্দুমেলা তাঁকে জনসমক্ষে আসার সাহস দিয়েছিল, আর নবগোপাল মিত্রের সাহচর্য তাঁকে জাতীয় সংহতির গুরুত্ব বুঝিয়েছিল। এই কিশোর বয়সের অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে 'বঙ্গভঙ্গ' আন্দোলনের সময় তাঁর নেতৃত্ব এবং স্বদেশী সঙ্গীতের অফুরন্ত ভাণ্ডার গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।

আপনি কি এই উত্তরের সাথে হিন্দুমেলায় রবীন্দ্রনাথের গাওয়া গানের কোনো বিশেষ চরণের উদ্ধৃতি যোগ করতে চান?


Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...