স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি গ্রন্থে নিবেদিতার দৃষ্টিতে সারদা দেবীর পরিচয় যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে তার বর্ণনা দাও।
ভগিনী নিবেদিতা তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘স্বামীজিকে যেরূপ দেখিয়াছি’ (The Master as I Saw Him)-এ শ্রীমা সারদা দেবীকে এক অনন্য আধ্যাত্মিক ও মানবিক উচ্চতায় উপস্থাপন করেছেন। নিবেদিতার কাছে সারদা দেবী ছিলেন কেবল স্বামীজির গুরুপত্নী বা শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণী নন, বরং তিনি ছিলেন ‘আদর্শ ভারতীয় নারীত্বের’ এক জীবন্ত বিগ্রহ।
নিবেদিতার দৃষ্টিতে সারদা দেবীর পরিচয়ের প্রধান দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. আধ্যাত্মিকতার মূর্ত প্রতীক ও প্রশান্তি:
নিবেদিতা শ্রীমাকে দেখেছিলেন এক গভীর প্রশান্তির আধার হিসেবে। তিনি লিখেছেন, শ্রীমায়ের জীবন ছিল ‘এক দীর্ঘ ও নিরবচ্ছিন্ন প্রার্থনা’ ("Her life is one long stillness of prayer")। নিবেদিতার কাছে তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল অত্যন্ত সৌম্য এবং তাঁর উপস্থিতিই চারপাশের পরিবেশকে শান্ত ও পবিত্র করে তুলত।
২. আভিজাত্য ও সারল্যের সমন্বয়:
শ্রীমা সারদা দেবীর চরিত্রের একটি দিক নিবেদিতাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছিল—তা হলো তাঁর রাজকীয় সৌজন্য ও অসাধারণ সরলতা। নিবেদিতা লক্ষ্য করেন যে, অত্যন্ত সাধারণ গ্রামীণ পরিবেশে বসবাস করা সত্ত্বেও শ্রীমায়ের চালচলন ও আচার-ব্যবহারে এক সহজাত আভিজাত্য বা ‘Stateliness of courtesy’ ছিল। তাঁর এই ম্লানাতীত মাধুর্য ও বুদ্ধিমত্তা নিবেদিতার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছিল।
৩. বিশ্বজনীন মাতৃত্ব:
নিবেদিতার বর্ণনায় সারদা দেবী কেবল তাঁর নিজ সন্তানদের মা নন, বরং তিনি ছিলেন ‘সবার মা’। নিবেদিতা নিজে আইরিশ হয়েও শ্রীমায়ের কাছ থেকে যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আশ্রয় পেয়েছিলেন, তাতে তিনি তাঁকে নিজের ‘মাতা’ হিসেবেই গ্রহণ করেন। নিবেদিতা উল্লেখ করেছেন যে, শ্রীমায়ের ভালোবাসা কোনো সাময়িক আবেগ নয়, বরং তা এক ‘স্বর্ণালী আভা’র মতো, যা সবার মঙ্গল কামনা করে এবং কারও প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না।
৪. প্রাচ্যের আদর্শ নারী:
স্বামীজি যেমন পাশ্চাত্য থেকে নিবেদিতাকে এনেছিলেন ভারতের নারী জাগরণের জন্য, তেমনি তিনি নিবেদিতার সামনে প্রাচ্যের আদর্শ নারী হিসেবে সারদা দেবীকে স্থাপন করেছিলেন। নিবেদিতা উপলব্ধি করেছিলেন যে, প্রথাগত অক্ষরজ্ঞান না থাকলেও শ্রীমা ছিলেন প্রজ্ঞা ও করুণার পরম উৎস। তাঁর কাছে শ্রীমা ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের ‘প্রেমের পাত্র’ (Chalice of His Love), যা তিনি উত্তরসূরিদের জন্য রেখে গেছেন।
৫. সংস্কারমুক্ত উদার মন:
নিবেদিতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলেন যে, তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের অংশ হওয়া সত্ত্বেও শ্রীমা ছিলেন অত্যন্ত উদারমনা। বিদেশি নিবেদিতাকে সাদরে গ্রহণ করা এবং তাঁর সাথে একত্রে ভোজন করা শ্রীমায়ের সেই বিস্ময়কর উদারতারই পরিচয় দেয়, যা নিবেদিতার কাছে ‘পরম আশীর্বাদ’ স্বরূপ ছিল।
উপসংহার:
নিবেদিতার বর্ণনায় সারদা দেবী কেবল একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নন, বরং তিনি ছিলেন এমন এক শক্তি যিনি নিঃশব্দে মানুষের হৃদয়ে আধ্যাত্মিকতার বীজ বপন করেন। ‘স্বামীজিকে যেরূপ দেখিয়াছি’ গ্রন্থে নিবেদিতা শ্রীমাকে একাধারে ঈশ্বরী এবং এক স্নেহময়ী গ্রাম্য জননী হিসেবে অঙ্কন করেছেন, যা পাঠককে তাঁর অসীম ধৈর্য ও সেবাব্রতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
Comments
Post a Comment