Skip to main content

ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’: রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মেদিনীপুরের দিনলিপি আলোচনা করো।

'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’ গ্ৰন্থের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মেদিনীপুরের দিনলিপি আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর) 

          আমরা জানি যে,শিবরাম চক্রবর্তী মূলত তাঁর হাস্যরসের জন্য বাঙালি পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হলেও, তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দলিল। এই গ্রন্থে ১৯২০-এর দশকের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মেদিনীপুরের দিনলিপি এক অনন্য মাত্রায় প্রতিফলিত হয়েছে।

        রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অসহযোগ ও সশস্ত্র বিপ্লবের পটভূমি ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা। যে গ্রন্থটির  রচনাকাল ও প্রেক্ষাপট মূলত বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের উত্তাল সময়। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতে তখন অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছে। শিবরাম এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন। গ্রন্থে দেখা যায়, তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ঘর ছেড়েছিলেন। সেই সময়ের রাজনীতি কেবল মিটিং-মিছিলে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল আদর্শবাদের লড়াই।আসলে-

        অসহযোগ আন্দোলনের পাশাপাশি সমান্তরালভাবে বহমান সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের ছায়াও এই গ্রন্থে পাওয়া যায়। মেদিনীপুর সেই সময় ছিল বিপ্লবীদের মূল কেন্দ্র। পুলিশের দমন-পীড়ন, জেল-জীবন এবং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক চেতনার এক অকপট চিত্র শিবরাম এখানে এঁকেছেন।

     মেদিনীপুরের দিনলিপি ও সংগ্রামের অন্দর মহল 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’। আসলে এই গ্রন্থে মেদিনীপুরের দিনলিপি অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিবরামের রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অংশ অতিবাহিত হয়েছিল মেদিনীপুরে। মেদিনীপুর তখন ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক।আর সেখানে আমরা দেখি-

         বিপ্লবী কেন্দ্র হিসেবে মেদিনীপুর।শিবরাম বর্ণনা করেছেন কীভাবে মেদিনীপুরের আনাচে-কানাচে বিপ্লবের মন্ত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি মেদিনীপুরে গিয়ে রাজনীতির এক রুক্ষ কিন্তু জীবন্ত রূপের মুখোমুখি হন। রাজনীতির দায়ে মেদিনীপুরের জেলে বন্দি থাকার দিনগুলো তাঁর ডায়েরি বা দিনলিপির মতো ফুটে উঠেছে। জেলখানায় বন্দিদের ওপর অত্যাচার এবং সেখানে বসেও স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা—এই বৈপরীত্য তিনি সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন।তুলে ধরেছেন-

        মেদিনীপুরের মানুষ ও প্রকৃতি। তিনি কেবল রাজনৈতিক ঘটনাই লেখেননি, মেদিনীপুরের সাধারণ মানুষের অদম্য জেদ এবং মাটির প্রতি টানকেও তাঁর লেখনীতে স্থান দিয়েছেন। মেদিনীপুরের শুষ্ক আবহাওয়া আর মানুষের তপ্ত মেজাজ যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে।

          রাজনৈতিক দর্শনের বিবর্তন হিসেবে ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা।শিবরামের এই গ্রন্থে রাজনীতি কেবল দলীয় সংঘাত নয়, বরং তা ছিল আত্মানুসন্ধানের পথ। তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্নেহধন্য ছিলেন। গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে কীভাবে তিনি 'দেশ' পত্রিকা সম্পাদনার সাথে যুক্ত হলেন এবং রাজনৈতিক প্রচারের কাজে মেদিনীপুরের বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বেড়ালেন। তাঁর অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে যে, রাজনীতি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন বা 'ভালোবাসা'কে কীভাবে প্রভাবিত করে-যা গ্রন্থের নামকরণের সার্থকতাকেও পুষ্ট করে।

          হাস্যরসের আড়ালে রাজনৈতিক সত্য উদঘাটনে ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা।শিবরামের স্বভাবজাত হাস্যরস এই গ্রন্থে বিদ্যমান থাকলেও, রাজনৈতিক অংশগুলোতে তিনি অত্যন্ত নির্মোহ ও সত্যনিষ্ঠ। মেদিনীপুরের প্রশাসনিক কঠোরতা এবং তার বিপরীতে বিপ্লবীদের সাহসিকতাকে তিনি কোনো অলৌকিক রঙ না চড়িয়ে বাস্তবানুগভাবে উপস্থাপন করেছেন।

           পরিশেষে বলা যায় যে,‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’ কেবল একটি আত্মস্মৃতি নয়, এটি তৎকালীন মেদিনীপুরের এক প্রামাণ্য রাজনৈতিক দিনলিপি। মহাত্মা গান্ধীর অহিংসা আর মেদিনীপুরের সশস্ত্র বিপ্লবের এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে শিবরাম তাঁর ব্যক্তিজীবন ও রাজনৈতিক জীবনকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। মেদিনীপুরের সেই উত্তাল দিনগুলোই শিবরামকে একজন লেখক ও সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিল, যার প্রতিফলন এই গ্রন্থে স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...