একাঙ্ক নাটকঃ যে নাটক কেবল একটি মাত্র অঙ্কে (Act) সমাপ্ত হয় এবং যাতে মানবজীবনের কোনো একটি বিশেষ মুহূর্ত বা অখণ্ড খণ্ডচিত্র সার্থকভাবে ফুটে ওঠে, তাকেই একাঙ্ক নাটক বলা হয়। এটি পূর্ণাঙ্গ নাটকের সংক্ষিপ্ত রূপ নয়, বরং একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পরূপ।
একাঙ্ক নাটক হলো নাট্যসাহিত্যের এমন একটি রূপভেদ যা মাত্র একটি অঙ্কে সমাপ্ত হয়। আধুনিক ব্যস্ত জীবনে অল্প সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ রসাস্বাদনের জন্য এই নাটক অত্যন্ত জনপ্রিয়।সহজ কথায় বলা যায় যে- যে নাটকের কাহিনী বিন্যাস, দ্বন্দ্ব এবং পরিণাম একটি মাত্র অঙ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাকেই একাঙ্ক নাটক বলা হয়।
•একাঙ্ক নাটকের বৈশিষ্ট্য
১)অঙ্ক ও দৃশ্যঃ এই নাটকে অঙ্ক মাত্র একটিই থাকে। দৃশ্য একাধিক হতে পারে, তবে কাহিনী বিরতিহীনভাবে এগিয়ে চলাই এর ধর্ম।
২)ঘটনার ঐক্যঃ এখানে কোনো উপকাহিনী বা পার্শ্বচরিত্রের আধিক্য থাকে না। একটি মূল লক্ষ্য বা ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাটকটি আবর্তিত হয়।
৩)চরিত্রের স্বল্পতাঃ সময় ও পরিসর কম হওয়ার কারণে চরিত্রের সংখ্যা খুবই সীমিত থাকে। দুই বা তিনটি প্রধান চরিত্রের মাধ্যমেই নাটকীয়তা তুঙ্গে নেওয়া হয়।
৪)সংক্ষিপ্ততা ও গতিশীলতাঃঅহেতুক বর্ণনা বা দীর্ঘ সংলাপ এখানে বর্জিত। শুরু থেকেই কাহিনী দ্রুত চরম পরিণতির (Climax) দিকে ধাবিত হয়।
৫)স্থান ও সময়ের ঐক্যঃ সাধারণত একটি নির্দিষ্ট স্থানে এবং অল্প সময়ের ঘটনাকে এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়।
৬) তীক্ষ প্রভাবঃ নাটকের শেষে দর্শকদের মনে এক গভীর ও অবিস্মরণীয় রেশ বা ধাক্কা (Impact) সৃষ্টি করা একাঙ্ক নাটকের প্রধান সার্থকতা।
•একটি উল্লেখযোগ্য সার্থক একাঙ্ক নাটক: 'মুক্তি'
বাংলা একাঙ্ক নাটকের ইতিহাসে **মন্মথ রায়ের 'মুক্তি' (১৯২২)** একটি কালজয়ী সৃষ্টি। ছাত্র-ছাত্রীদের সুবিধার জন্য এর বিস্তারিত পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:
### **১. নাট্যকারের পরিচয়:**
মন্মথ রায় ছিলেন বাংলা নাট্যসাহিত্যের ধারায় 'একাঙ্ক নাটকের জনক'। সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে তার নাটকে ব্যবহার করেছেন।
### **২. পটভূমি ও বিষয়বস্তু:**
'মুক্তি' নাটকটি ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে রচিত। প্রতীকী ব্যঞ্জনার মাধ্যমে এখানে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরা হয়েছে। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র **শেফালী**। তার বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির কঠোর অনুশাসন এবং স্বামী **অজিতের** উদাসীনতা তাকে এক মানসিক বন্দিদশায় ফেলে দেয়।
### **৩. কাহিনীর সংক্ষিপ্তসার:**
নাটকটিতে দেখা যায়, শেফালী একটি খাঁচাবন্দি পাখিকে মুক্ত করে দিতে চায়। এই পাখিটি আসলে শেফালীর নিজের জীবনেরই এক প্রতীক। সে অনুভব করে, সোনার খাঁচায় বন্দি থাকা পাখির যেমন কোনো সার্থকতা নেই, তেমনি বিলাসবহুল অন্দরমহলে বন্দি নারীজীবনেরও কোনো মূল্য নেই।
নাটকের শেষে যখন সে পাখিটিকে মুক্ত করে দেয়, তখন সেটি আসলে তার নিজের অন্তরের স্বাধীনতারই বহিঃপ্রকাশ। এই ব্যক্তিগত মুক্তিই বৃহত্তর অর্থে দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
### **৪. কেন এটি সার্থক একাঙ্ক নাটক?**
* **সংহতি:** নাটকটিতে কোনো বাড়তি অলংকার নেই। শেফালী ও অজিতের কথোপকথনের মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনের জটিলতা এবং মুক্তির ব্যাকুলতা চমৎকারভাবে ফুটেছে।
* **প্রতীকী ব্যবহার:** খাঁচাবন্দি পাখি এবং শেফালীর জীবনকে সমান্তরালভাবে ব্যবহার করে নাট্যকার গভীর ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছেন।
* **নাটকীয় সমাপ্তি:** নাটকটির শেষ অংশ অত্যন্ত চমকপ্রদ এবং ভাবগম্ভীর, যা একাঙ্ক নাটকের অন্যতম প্রধান শর্ত।
**শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ:** পরীক্ষায় উত্তর লেখার সময় পয়েন্ট করে লিখলে নম্বর বেশি পাওয়া যায়। বিশেষ করে 'মুক্তি' নাটকের প্রতীকী তাৎপর্যটি উল্লেখ করলে উত্তরটি মানসম্পন্ন হবে।
ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার প্রয়োজন মাথায় রেখে বাংলা সাহিত্যের একটি সার্থক একাঙ্ক নাটক হিসেবে **মন্মথ রায়ের ‘মুক্তি’** নাটকের বিস্তারিত পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:
## একটি সার্থক একাঙ্ক নাটক: মন্মথ রায়ের ‘মুক্তি’
বাংলা নাট্যসাহিত্যে মন্মথ রায়কে একাঙ্ক নাটকের প্রবর্তক বলা হয়। ১৯২২ সালে রচিত তাঁর **‘মুক্তি’** নাটকটি আঙ্গিক ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে একটি সার্থক একাঙ্ক নাটক।
### **নাটকটির প্রেক্ষাপট ও বিষয়বস্তু:**
নাটকটি একাধারে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক মুক্তির বার্তাবাহী। এর কাহিনী গড়ে উঠেছে এক উচ্চবিত্ত পরিবারের অন্তঃপুরে। নাটকের মূল চরিত্র **শেফালী** একজন সংবেদনশীল নারী, যে তার স্বামী **অজিতের** অঢেল ঐশ্বর্যের মধ্যে থেকেও নিজেকে বন্দি মনে করে। অজিত মনে করে অর্থ এবং বিলাসিতাই জীবনের সব, কিন্তু শেফালীর কাছে হৃদয়ের স্বাধীনতা অনেক বড়। শেফালীর এই মানসিক দ্বন্দ্ব এবং মুক্তি পাওয়ার তীব্র বাসনাই নাটকের মূল উপজীব্য।
### **কাহিনী সংক্ষেপ ও নাটকীয়তা:**
নাটকটির শুরুতে দেখা যায় শেফালী একটি খাঁচাবন্দি পাখির সেবা করছে। এই পাখিটি মূলত শেফালীর নিজের জীবনেরই এক নিপুণ **প্রতীক**। অজিত যখন শেফালীকে হীরের গয়না দিয়ে খুশি করতে চায়, শেফালী তখন সেই গয়নার ঔজ্জ্বল্যের চেয়ে আকাশের নীলিমায় বেশি আকর্ষণ বোধ করে। শেফালী বুঝতে পারে, সোনার খাঁচায় বন্দি পাখির যেমন কোনো সার্থকতা নেই, তেমনি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কঠোর অনুশাসনে বন্দি নারীজীবনেরও কোনো প্রকৃত আনন্দ নেই।
নাটকের চরম মুহূর্তে (Climax) দেখা যায়, শেফালী তার পোষা পাখিটিকে খাঁচা থেকে মুক্ত করে দিচ্ছে। পাখিটির উড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শেফালীর নিজের আত্মার মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়। এই মুক্তি কেবল গৃহবধূর সাংসারিক মুক্তি নয়, এটি তৎকালীন পরাধীন ভারতবর্ষের মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতারও এক রূপক সংকেত।
### **সার্থকতা বিচার:**
১. **ঐক্যনীতি:** নাটকটিতে স্থান, কাল ও ঘটনার চমৎকার ঐক্য বজায় রাখা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট কক্ষের ভেতরেই সমস্ত ঘটনা সমাপ্ত হয়েছে।
২. **চরিত্রায়ন:** শেফালী ও অজিত—এই দুটি মাত্র চরিত্রের সংঘাতের মধ্য দিয়ে নাট্যকার গভীর জীবনদর্শন ফুটিয়ে তুলেছেন।
৩. **প্রতীকের ব্যবহার:** খাঁচাবন্দি পাখি এবং বাইরের মুক্ত আকাশ—এই দুইয়ের বৈপরীত্য নাটকটিকে অনন্য উচ্চতা দিয়েছে।
৪. **আকস্মিক সমাপ্তি:** একাঙ্ক নাটকের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, নাটকটির সমাপ্তি অত্যন্ত ব্যঞ্জনাধর্মী। শেফালীর এই ‘মুক্তি’ দর্শকদের মনে এক গভীর প্রশ্ন ও রেশ রেখে যায়।
**উপসংহার:** স্বল্প পরিসরে ঘনীভূত আবেগ এবং সুসংহত কাহিনীর কারণে মন্মথ রায়ের ‘মুক্তি’ বাংলা একাঙ্ক নাটকের ইতিহাসে একটি শ্রেষ্ঠ মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত।
Comments
Post a Comment