Skip to main content

ফরাসি বিপ্লবের দার্শনিকদের অবদান আলোচনা করো।

ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯)দার্শনিকদের অবদান আলোচনা করো। (রুশো, ভলতেয়ার এবং মন্তেস্কুর চিন্তাধারা কীভাবে ফরাসি বিপ্লবকে প্রভাবিত করেছিল?) পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।

       আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ফরাসি বিপ্লব কেবল একটি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ঘটনা ছিল না, এটি ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের একটি বৌদ্ধিক বহিঃপ্রকাশ। অষ্টাদশ শতাব্দীর যুক্তিবাদী আন্দোলন বা 'Enlightenment' ফরাসিদের শেখায় যে, রাজতন্ত্র বা গির্জার শাসন কোনো অলঙ্ঘনীয় বিধান নয়। ঐতিহাসিক উইল ডুরান্ট-এর মতে-

 "বিপ্লবের বারুদ স্তূপীকৃত ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে, কিন্তু তাতে অগ্নিসংযোগ করেছিলেন দার্শনিকরা।"

       আসলে অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সে এমন একদল চিন্তাবিদের আবির্ভাব ঘটে যারা যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ এবং স্বাধীনতার বাণী প্রচার করেন। তাঁদের এই চিন্তাধারাকে কেন্দ্র করেই ফরাসি সমাজের প্রাচীন ঘুণে ধরা ব্যবস্থার (Ancien Régime) বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে। ঐতিহাসিক লেফেভার-এর মতে-

"দার্শনিকরাই বিপ্লবের বৌদ্ধিক ভিত্তি প্রস্তুত করেছিলেন।"

১) মন্তেস্কু (Montesquieu): ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ

​       •মঁন্তেস্কু ছিলেন নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের সমর্থক। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য স্পিরিট অফ লজ' (The Spirit of Laws, ১৭৪৮)-এ তিনি ফরাসি রাজতন্ত্রের স্বৈরাচারী ক্ষমতার সমালোচনা করেন। আর সেখানে তিনি  বলেন যে, শাসন, বিচার ও আইন-এই তিনটি ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে থাকলে স্বৈরাচার জন্ম নেয়। তাই তিনি 'ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ' (Separation of Powers) নীতির প্রস্তাব দেন। আসলেই তাঁর এই মতবাদ সেদিন ফরাসি মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে রাজতন্ত্রের বিকল্প শাসনের স্বপ্ন দেখতে সহায়তা করেছিল।

        আসলে মঁতেস্কু ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের উদারপন্থী চেতনার পথিকৃৎ। ১৭৪৮ সালে প্রকাশিত তাঁর 'The Spirit of Laws' গ্রন্থে তিনি প্রমাণ করেন যে- রাজতন্ত্রের স্বৈরাচার সমাজকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। শুধু তাই নয় তিনি আরো বলেন যে-

​"যখন আইন ও শাসন ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে থাকে, তখন সেখানে কোনো স্বাধীনতা থাকে না।"

​     আর সেই কারণেই তাঁর প্রবর্তিত 'ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি' বিপ্লবীদের মনে এক নতুন শাসনতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রেরণা দেয়। তিনি ইংল্যান্ডের শাসনব্যবস্থার অনুকরণে ফ্রান্সে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের প্রস্তাব করেছিলেন।

২) ভলতেয়ার (Voltaire): গির্জা ও কুসংস্কারের বিরোধিতা

​      ভলতেয়ার ছিলেন মুক্তচিন্তার অগ্রদূত। তিনি তাঁর ব্যঙ্গাত্মক লেখনীর মাধ্যমে তৎকালীন সমাজ ও ধর্মীয় ব্যবস্থার অসারতা প্রমাণ করেন।তবে তাঁর প্রধান আক্রমণ ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত ক্যাথলিক গির্জার বিরুদ্ধে। তিনি গির্জাকে 'একটি কলঙ্কিত প্রতিষ্ঠান' হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও সহিষ্ণুতার কথা বলেন।

​     আসলে ভলতেয়ারের লেখনী ফরাসিদের মনে অন্ধবিশ্বাসের বদলে যুক্তিবাদের সঞ্চার করে, যা গির্জার একাধিপত্যকে চূর্ণ করতে সাহায্য করেছিল।তবে ভলতেয়ার ছিলেন ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় প্রবক্তা। তিনি সমকালীন দুর্নীতিগ্রস্ত ক্যাথলিক গির্জা এবং বিচার ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন। তাই তিনি বলতে পেরেছিলেন-

​"Ecrasez l'infame" (সেই কলঙ্কিত প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংস করো)

​     তবে ভলতেয়ার মানুষের বাক-স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতার সপক্ষে যুক্তি দেন। তাঁর লেখনী মানুষের মন থেকে গির্জার অলৌকিক ভয় দূর করে যুক্তির প্রতিষ্ঠা ঘটায়। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল- "আমি তোমার মতের সঙ্গে একমত না হতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য আমি আমৃত্যু লড়াই করব।"

৩)রুশো (Jean-Jacques Rousseau): জনগণের সার্বভৌমত্ব

​       ফরাসি বিপ্লবের প্রধান অনুপ্রেরণা ছিলেন জঁ জ্যাক রুশো। তাঁকে 'ফরাসি বিপ্লবের জনক' বলা হয়। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ হলো 'দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট' (The Social Contract, ১৭৬২)। আর সেই গ্রন্থে জনগণের উদ্দেশ্যে বার্তা দেন যে-

"মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন, কিন্তু সর্বত্রই সে শৃঙ্খলিত।

" তিনি রাজার 'দৈবস্বত্ব' অস্বীকার করে 'সাধারণ ইচ্ছা' (General Will) বা জনগণের সার্বভৌমত্বের কথা প্রচার করেন। আর সেখানে রুশোর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই বিপ্লবীরা "সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা"র স্লোগান তুলেছিলেন।

        আসলে বিপ্লবীদের ওপর সবচেয়ে গভীর প্রভাব ছিল জঁ জ্যাক রুশোর। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ছিল প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের ভিত্তি। ১৭৬২ সালে প্রকাশিত তাঁর 'The Social Contract' গ্রন্থটি বিপ্লবীদের কাছে 'বাইবেল' সমতুল্য ছিল।

​        রুশো রাজার 'দৈবস্বত্ব' তত্ত্বকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করেন। তিনি বলেন, রাজা ও জনগণের মধ্যে একটি 'সামাজিক চুক্তি' বিদ্যমান; রাজা যদি সেই চুক্তির মর্যাদা না দেন, তবে জনগণ তাঁকে পদচ্যুত করার অধিকার রাখে। তাঁর 'সাধারণ ইচ্ছা' (General Will) তত্ত্বটিই মূলত ফরাসি বিপ্লবের সাম্য ও স্বাধীনতার ভিত্তি তৈরি করেছিল।

বিশ্বকোষ প্রণেতা ও ফিজিওক্র্যাটগণ

​      ফরাসি বিপ্লবের ক্ষেত্রে দার্শনিকদের পাশাপাশি ডিডরো এবং ডি'অ্যাল্যামবার্ট সম্পাদিত 'এনসাইক্লোপিডিয়া' বা বিশ্বকোষ সমকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটায়। অন্যদিকে, ফিজিওক্র্যাট (Physiocrats) নামক একদল অর্থনীতিবিদ অবাধ বাণিজ্যের কথা বলে ফরাসি অর্থনীতির সংস্কারের দাবি তোলেন।

       ​পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, দার্শনিকরা সরাসরি বিপ্লব না ঘটালেও তাঁরা ফরাসি জাতির সামনে একটি আয়না ধরেছিলেন, যেখানে সাধারণ মানুষ তাদের দাসত্ব ও বঞ্চনার চিত্র দেখতে পায়। তাঁদের প্রগতিশীল চিন্তা ফরাসি জনগণের দীর্ঘদিনের সুপ্ত অসন্তোষকে দাবানলে পরিণত করেছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৭৮৯ সালের ঐতিহাসিক বিপ্লব।

 ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং '𝐒𝐡𝐞𝐬𝐡𝐞𝐫 𝐊𝐚𝐛𝐢𝐭𝐚 𝐒𝐮𝐧𝐝𝐚𝐫𝐛𝐨𝐧' 𝐘𝐨𝐮𝐭𝐮𝐛𝐞 𝐂𝐡𝐚𝐧𝐞𝐥 𝐒𝐀𝐌𝐀𝐑𝐄𝐒𝐇 𝐒𝐈𝐑.





Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...