ঐতিহাসিক উপন্যাসের সংজ্ঞা দাও। ঐতিহাসিক উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো। একটি সার্থক ঐতিহাসিক উপন্যাসের নাম উল্লেখ করে সেটি আসলে ঐতিহাসিক উপন্যাস কিনা তা আলোচনা করে দেখাও।
ঐতিহাসিক উপন্যাসের সংজ্ঞা দাও। ঐতিহাসিক উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো। একটি সার্থক ঐতিহাসিক উপন্যাসের নাম উল্লেখ করে সেটি আসলে ঐতিহাসিক উপন্যাস কিনা তা আলোচনা করে দেখাও। পশ্চিমবঙ্গের রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর DS-5, Unit2/b
• ঐতিহাসিক উপন্যাসঃ যে উপন্যাসে কোনো একটি বিশেষ যুগের ঐতিহাসিক ঘটনা বা চরিত্রকে কেন্দ্র করে কাহিনি গড়ে ওঠে এবং সেই যুগের সমাজ-ভাবনা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জীবনযাত্রার সাথে লেখকের কল্পনা মিশ্রিত হয়ে একটি রসোত্তীর্ণ সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি হয়, তাকেই ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা হয়। এতে ইতিহাসের কঙ্কালের ওপর কল্পনার রক্ত-মাংস যোগ করে অতীতকে বর্তমানের মতো জীবন্ত করে তোলা হয়।
•ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
একটি সার্থক ঐতিহাসিক উপন্যাসে সাধারণত যে সকল বৈশিষ্ট্যগুলি থাকা প্রয়োজন সেগুলি হলো-
১. ঐতিহাসিক ভিত্তিঃ উপন্যাসের মূল কাহিনি অবশ্যই ইতিহাসের কোনো সত্য ঘটনা বা নির্দিষ্ট কোনো ঐতিহাসিক যুগের প্রেক্ষাপটে রচিত হতে হবে। ইতিহাস এখানে কেবল পটভূমি নয়, বরং কাহিনির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
২.ইতিহাস ও কল্পনার সমন্বয়ঃ ঐতিহাসিক উপন্যাসে ইতিহাস এবং সাহিত্যিক কল্পনা হাত ধরাধরি করে চলে। লেখক ইতিহাসের শুষ্ক কঙ্কালের ওপর কল্পনার রক্ত-মাংস চড়িয়ে তাকে জীবন্ত করে তোলেন। তবে এই কল্পনা যেন কখনও ইতিহাসকে অস্বীকার না করে।
৩. যুগ-আবহ সৃষ্টিঃযে সময়ের গল্প বলা হচ্ছে, সেই সময়ের সমাজব্যবস্থা, মানুষের রুচি, পোশাক-আশাক, রীতিনীতি এবং বিশ্বাসকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা। পাঠক যেন পড়তে পড়তে সেই সুদূর অতীতে পৌঁছে যান।
৪. চরিত্রের শ্রেণিবিন্যাসঃউপন্যাসে দুই ধরণের চরিত্র থাকে— ঐতিহাসিক চরিত্র (যেমন: আকবর, সিরাজউদ্দৌলা) এবং লেখকের সৃষ্ট কাল্পনিক চরিত্র। এই দুই ধরণের চরিত্রের মধ্যে এমন ভারসাম্য বজায় রাখা হয় যাতে কাউকে কৃত্রিম মনে না হয়।
৫. ঐতিহাসিক সত্যের মর্যাদাঃলেখক কল্পনা করতে পারেন, কিন্তু তিনি পরিচিত ঐতিহাসিক সত্যকে বিকৃত করতে পারেন না। যেমন— যুদ্ধে কে জয়ী হয়েছিল বা কার মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল, তা পরিবর্তনের সুযোগ খুব কম থাকে।
৬. স্থানের বিশ্বস্ততাঃঐতিহাসিক ঘটনায় স্থানের গুরুত্ব অপরিসীম। দুর্গের গঠন, যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনা বা ভৌগোলিক অবস্থান যেন সেই সময়ের ঐতিহাসিক বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
৭. উপযুক্ত ভাষা ব্যবহারঃঐতিহাসিক উপন্যাসের ভাষা সমকালীন উপন্যাসের চেয়ে কিছুটা আলাদা হওয়া প্রয়োজন। প্রাচীন বা মধ্যযুগীয় গাম্ভীর্য বজায় রাখতে তৎসম শব্দ বা সেই যুগের বিশেষ বিশেষ্য পদের ব্যবহার এর শ্রী বৃদ্ধি করে।
৮. রস সৃষ্টিঃইতিহাস যেখানে কেবল তথ্য পরিবেশন করে, ঐতিহাসিক উপন্যাস সেখানে জীবনরস পরিবেশন করে। ব্যক্তিগত প্রেম, বিরহ, ঈর্ষা বা বীরত্বকে কেন্দ্র করে সাহিত্যের রস সৃষ্টি করাই এর মূল লক্ষ্য।
৯. জাতীয় জীবনের চিত্রঃঅনেক সময় ঐতিহাসিক উপন্যাসে কোনো জাতির উত্থান-পতন, বিপ্লব বা কোনো বৃহৎ জাতীয় সংকটের চিত্র ফুটে ওঠে, যা সাধারণ মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
১০. বিশ্বাসযোগ্যতাঃউপন্যাসের কাল্পনিক অংশটুকুও যেন সেই যুগের সাপেক্ষে যুক্তিগ্রাহ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হয়। অর্থাৎ, মধ্যযুগের কোনো চরিত্রে আধুনিক একবিংশ শতাব্দীর মনস্তত্ত্ব আরোপ করলে তার ঐতিহাসিক আবেদন নষ্ট হয়।
•(বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বা প্রমথনাথ বিশীর লেখনীতে আমরা এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সার্থক প্রয়োগ দেখতে পাই।)
•বঙ্কিমচন্দ্রের 'রাজসিংহ' আদর্শ ঐতিহাসিক উপন্যাসের সার্থকতা বিচার।
বাংলা উপন্যাসের স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে একাধিক ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাস রচনা করলেও, একমাত্র 'রাজসিংহ' (বিশেষত ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত এর চতুর্থ সংস্করণ) উপন্যাসটিকেই প্রকৃত 'ঐতিহাসিক উপন্যাস' হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়। কথাসাহিত্যের রূপভেদ বিচারে একটি আদর্শ ঐতিহাসিক উপন্যাসের যেসব গুণ থাকা প্রয়োজন, 'রাজসিংহ' তার কষ্টিপাথরে কতটুকু উত্তীর্ণ, তা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো-
১. ইতিহাসের মূল কাঠামোর বিশ্বস্ততাঃ আদর্শ ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রথম শর্ত হলো ইতিহাসের মূল ধারাকে রক্ষা করা। 'রাজসিংহ' উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র জেমস টডের 'অ্যানালস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিজ অব রাজস্থান' এবং মোগল ইতিহাসের উপাদান ব্যবহার করেছেন। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের হিন্দুবিদ্বেষ, মেবারের রাণা রাজসিংহের অদম্য জাতীয়তাবোধ এবং উভয়ের মধ্যে ঐতিহাসিক যুদ্ধের যে চিত্র বঙ্কিমচন্দ্র এঁকেছেন, তা ইতিহাসের মূল সত্য থেকে বিচ্যুত হয়নি।
২. ইতিহাস ও কল্পনার শৈল্পিক সমন্বয়ঃ ইতিহাস যেখানে শেষ হয়, ঔপন্যাসিকের কল্পনা সেখান থেকেই শুরু হয়। এই উপন্যাসে আওরঙ্গজেব বা রাজসিংহের মতো বলিষ্ঠ ঐতিহাসিক চরিত্রের পাশাপাশি চঞ্চলকুমারী, নির্মলকুমারী বা মাণিকলালের মতো কাল্পনিক চরিত্রগুলি এমনভাবে মিশে গেছে যে, তাদের পৃথক করা অসম্ভব। বিশেষ করে রূপনগরের রাজকন্যা চঞ্চলকুমারীকে কেন্দ্র করে যে যুদ্ধের সূচনা, তা ইতিহাসের তথ্যের সঙ্গে সাহিত্যের রসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
৩. যুগ-পরিবেশ বা 'পিরিয়ড অ্যাটমোস্ফিয়ার' সৃষ্টিঃ ঐতিহাসিক উপন্যাসে সেই বিশেষ সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ ফুটিয়ে তোলা জরুরি। বঙ্কিমচন্দ্র সপ্তদশ শতাব্দীর ভারতবর্ষের মোগল অন্তঃপুরের বিলাসবহুল জীবন, ষড়যন্ত্র এবং রাজপুতদের দুর্ধর্ষ বীরত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। মোগল শিবিরের অস্থিরতা এবং মেবারের পার্বত্য অঞ্চলের রণকৌশল বর্ণনায় লেখক চরম মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।
৪. জাতীয় জীবনের সংঘাতঃঅধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, প্রকৃত ঐতিহাসিক উপন্যাসে ব্যক্তিগত প্রেম-কাহিনির চেয়ে জাতীয় জীবনের বৃহত্তর সংঘাত বড় হয়ে ওঠে। বঙ্কিমচন্দ্রের 'দুর্গেশনন্দিনী'তে রোমান্স বা ব্যক্তিগত প্রণয় প্রাধান্য পেলেও 'রাজসিংহ'-এ হিন্দু ও মুসলমান শক্তির যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং একটি জাতির উত্থান-পতনের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে, তা একে সার্থক ঐতিহাসিক উপন্যাসের মর্যাদা দেয়।
৫. চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণঃ ঐতিহাসিক চরিত্রগুলিকে কেবল ইতিহাসের বইয়ের পাতা থেকে তুলে আনা হয়নি, বঙ্কিমচন্দ্র তাদের রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে গড়েছেন। আওরঙ্গজেবের কূটবুদ্ধি ও নিঃসঙ্গতা এবং জেবুন্নিসার প্রেম ও মানসিক দহন উপন্যাসে এক মানবিক মাত্রা যোগ করেছে। ইতিহাসের কঙ্কালে প্রাণের সঞ্চার করাই এই উপন্যাসের অন্যতম কৃতিত্ব।
পরিশেষে বলা যায় যে, ঐতিহাসিক উপন্যাসে ইতিহাসের সত্যকে অক্ষুণ্ণ রেখেও সৃজনশীল কল্পনার দ্বারা যে রস সৃষ্টি করতে হয়, 'রাজসিংহ' তার এক সার্থক উদাহরণ। ঘটনার ঘনঘটা, দ্রুতগামী কাহিনি এবং বৃহত্তর জাতীয় প্রেক্ষাপটের উপস্থিতির কারণে বঙ্কিমচন্দ্রের 'রাজসিংহ' কেবল তাঁর নিজের সৃষ্টির মধ্যেই নয়, বরং সমগ্র বাংলা সাহিত্যের একটি আদর্শ ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDORBON YouTube channel SAMARESH sir
Comments
Post a Comment