Skip to main content

উৎপ্রেক্ষা অলংকার কাকে বলে ? উৎপ্রেক্ষা অলংকারের শ্রেণীবিভাগ উদাহরণসহ আলোচনা করো।

উৎপ্রেক্ষা অলংকার কাকে বলে ? উৎপ্রেক্ষা অলংকারের শ্রেণীবিভাগ উদাহরণসহ আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।

          উৎপ্রেক্ষা অলংকারঃ কাব্যে যেখানে উপমেয়কে (যাকে তুলনা করা হচ্ছে) সাধারণ ধর্মের সাদৃশ্যের জন্য উপমান (যার সাথে তুলনা করা হচ্ছে) বলে মনে হয় বা উপমান হিসেবে কবি প্রবল সংশয় বা সম্ভাবনা প্রকাশ করেন, তখন তাকে উৎপ্রেক্ষা অলংকার বলে।সহজ কথায়-

        উপমেয় ও উপমানের মধ্যে সাদৃশ্য এত বেশি থাকে যে, কবি উপমেয়কে উপমান বলেই ভুল বা সংশয় প্রকাশ করেন। এই অলংকারে সাধারণত 'যেন', 'মনে হয়', 'বুঝি', 'বটে', 'নিশ্চয়', 'আশঙ্কা হয়' ইত্যাদি সম্ভাবনাবাচক শব্দ ব্যবহৃত হয়।উদাহরণ-

"মুখখানি যেন নীল পদ্ম।"

    ব্যাখ্যাঃ'মুখখানি' হলো উপমেয় এবং 'নীল পদ্ম' হলো উপমান। মুখের সৌন্দর্য দেখে কবির মনে প্রবল সম্ভাবনা বা সংশয় জেগেছে যে, মুখটি আসলে মুখ নয়, যেন একটি নীল পদ্ম। 'যেন' শব্দের দ্বারা এই সম্ভাবনা প্রকাশিত হওয়ায় এটি উৎপ্রেক্ষা অলংকার।

    •উৎপ্রেক্ষা অলংকারের শ্রেণীবিভাগ•

           উৎপ্রেক্ষা অলংকারকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়-

) বাচ্যেৎপ্রেক্ষা অলঙ্কার। এবং 

খ) প্রতীয়মানোৎপ্রেক্ষা অলঙ্কার।


      ক) বাচ্যেৎপ্রেক্ষা অলঙ্কারঃ যখন উপোমেয়কে উপমান বলে প্রবল সংশয় হয় এবং সম্ভাবনা বাচক সংশয় সূচক শব্দটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় তখন সেটি বাচ্যেৎপ্রেক্ষা অলঙ্কার হয়। আর এই অলংকারে যে সকল সংসারসূচক শব্দ থাকে সেগুলি হল- যেন,বুঝি, প্রায়, মনে হয়, বোধ হয় প্রভৃতি শব্দ। এই সকল শব্দগুলি দ্বারা বিষয়টি সংশয়সূচক উপলব্ধি অনুভব হয়।উদাহরণ-

 "সীতাহারা আমি যেন মনিহারা ফণি।"

      ব্যাখ্যাঃ 'আমি'(রামচন্দ্র) এখানে উপমেয় কে 'ফণি'(সাপ) উপমান বলে উৎকট সংশয় প্রকাশ হয়েছে। আর এই সংসারসূচক ভাবটি 'যেন' শব্দটি দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে। আসলে এখানে রামচন্দ্র সীতাকে হারিয়ে নিজেকে মনিহারা ফণি মনে করছেন। কারণ সাপের মাথায় যে ফণি থাকে তার আলোয় সাপ দেখতে পায়। আর সীতা রামের জীবনে যেন সেই মনি। সেই মনিকে হারিয়ে রামচন্দ্র আজ জগতে কোন কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। এমনই সংশয়ে রামের মনে দানা বেধেছে অতি সংশয়াপন্ন অনুভূতি থেকে। তাই এটি বাচ্যেৎপ্রেক্ষা অলংকার। 

     •বাচ্যেৎপ্রেক্ষা অলংকারকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয়। আর সেই ভাগ গুলি হলো-

১.বস্তুদ্ভব বাচ্যেৎপ্রেক্ষা অলঙ্কারঃ যেখানে একটি বস্তুকে অন্য একটি বস্তু বলে মনে হয় বা সম্ভাবনা প্রকাশ পায় এবং 'যেন' শব্দ উল্লেখ থাকে।উদাহরণ-

      "চাঁদ সওদাগরের ডিঙাগুলি যেন গাঙচিল।"

২.হেতুদ্ভব বাচ্যেৎপ্রেক্ষা অলঙ্কারঃযেখানে প্রকৃত কারণ বা হেতু নয়, এমন কিছুকে কাব্যে কারণ বা হেতু বলে কল্পনা করা হয় এবং সম্ভাবনাবাচক শব্দ উপস্থিত থাকে।

      •উদাহরণঃ"পায়ের নখের আলোয় অন্ধকার দূর করার জন্যই যেন তারা প্রণাম করছে।"

খ) প্রতীয়মানোৎপ্রেক্ষা অলংকারঃ যেখানে কাব্যে 'যেন', 'বুঝি' বা 'মনে হয়'-এর মতো কোনো সম্ভাবনাবাচক শব্দ সরাসরি উল্লেখ থাকে না, কিন্তু পুরো কবিতার অর্থ বা ভাব থেকে উৎপ্রেক্ষাটি মনে মনে প্রতীয়মান বা অনুমিত হয়, তাকে প্রতীয়মানোৎপ্রেক্ষা বলে।

       •উদাহরণ-"কুন্তল ওড়ে, আঁখি ঘোরে, যেন কাল ভুজঙ্গিনী খেলে।" (এখানে 'যেন' তুলে দিয়ে যদি লেখা হয়: "কুন্তল ওড়ে, আঁখি ঘোরে, কাল ভুজঙ্গিনী খেলে।")

     বিশ্লেষণঃ সংশোধিত লাইনে 'যেন' শব্দটি না থাকলেও চুল ওড়ার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে কাল ভুজঙ্গিনী বা সাপ খেলছে। এখানে উৎপ্রেক্ষাটি লুকিয়ে আছে বা প্রতীয়মান হচ্ছে।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...