শব্দের ত্রিবিধ শক্তির (অভিধা, লক্ষণা, ব্যঞ্জনা) মধ্যে ব্যঞ্জনার শ্রেষ্ঠত্ব কোথায়? আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা মেজর চতুর্থ সেমিস্টার।DS-5, Unit-III(কাব্য জিজ্ঞাসা)।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ভারতীয় সাহিত্যতত্ত্বে শব্দ ও অর্থের সম্বন্ধ অত্যন্ত গভীর। আচার্য মন্মটভট্ট তাঁর ‘কাব্যপ্রকাশ’ গ্রন্থে শব্দের তিনটি শক্তির উল্লেখ করেছেন- অভিধা, লক্ষণা ও ব্যঞ্জনা। এই শক্তির দ্বারা শব্দ তার অন্তর্নিহিত অর্থকে প্রকাশ করে। কাব্যে এই তিন শক্তিরই প্রয়োজন রয়েছে, তবে চমৎকারিত্ব ও রসসৃষ্টির বিচারে ব্যঞ্জনা শক্তিকে সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান দেওয়া হয়েছে।আর সেখানে-
১.অভিধা (বাচ্যার্থ)ঃ শব্দের যে শক্তি দ্বারা তার সাধারণ, অভিধানগত বা লোকপ্রসিদ্ধ প্রাথমিক অর্থটি সরাসরি প্রকাশ পায়, তাকে অভিধা বলে। এই শক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থকে বলা হয় 'বাচ্যার্থ'। যেমন-
"গঙ্গায় মাছ আছে।"
এখানে গঙ্গা বলতে জলপ্রবাহকে বোঝায়।
২.লক্ষণা (লক্ষ্যার্থ)ঃ যখন বাচ্যার্থ বা মুখ্যার্থের দ্বারা বাক্যের অর্থ সংগত হয় না, তখন মুখ্যার্থের সাথে যোগ রেখে যে অন্য একটি অর্থ গ্রহণ করতে হয়, তাকে লক্ষণা বলে। এর দ্বারা প্রাপ্ত অর্থকে 'লক্ষ্যার্থ' বলা হয়। যেমন-
"গঙ্গায় ঘোষপল্লী।"
জলপ্রবাহের ওপর ঘরবাড়ি থাকা অসম্ভব, তাই লক্ষণা শক্তির দ্বারা এর অর্থ দাঁড়ায় "গঙ্গার তীরে ঘোষপল্লী"।
৩.ব্যঞ্জনা (ব্যঙ্গ্যার্থ): অভিধা ও লক্ষণা যেখানে নিজের নিজের কাজ শেষ করে নিবৃত্ত হয়, তারপরেও যে শক্তির সাহায্যে বাক্যের একটি গভীর, চমৎকারিত্বপূর্ণ এবং হৃদয়গ্রাহী অর্থ প্রকাশিত হয়, তাকে ব্যঞ্জনা বলে। এই অর্থকে বলা হয় 'ব্যঙ্গ্যার্থ' বা 'ধ্বনিতার্থ'। যেমন-
"গঙ্গায় ঘোষপল্লী"
বাক্যটির লক্ষ্যার্থ 'গঙ্গার তীর' হলেও, ব্যঞ্জনা শক্তির সাহায্যে এর ভেতরের আসল ভাবটি প্রকাশিত হয়— যা হলো গঙ্গার তীরের "শীতলতা ও পবিত্রতা"।
### ব্যঞ্জনা শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের কারণ
কাব্যতাত্ত্বিক ও অলংকারিকদের মতে, অভিধা ও লক্ষণা কাব্যের শরীর গঠন করে মাত্র, কিন্তু ব্যঞ্জনা হলো কাব্যের আত্মা। ব্যঞ্জনার এই শ্রেষ্ঠত্বের কারণগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
* **১. রসনিষ্পত্তি ও সহৃদয়-হৃদয়-সংবাদ:**
অভিধা শুধু তথ্য দেয় এবং লক্ষণা যুক্তির বাধা দূর করে। কিন্তু কেবল তথ্য বা যুক্তি দিয়ে কাব্য তৈরি হয় না। কাব্যের মূল লক্ষ্য হলো পাঠককে আনন্দ দেওয়া বা রস সৃষ্টি করা। ব্যঞ্জনা শক্তি সরাসরি বাচ্যার্থের গণ্ডি পেরিয়ে পাঠকের হৃদয়ে রসের সঞ্চার করে। অলংকারিক আনন্দবর্ধন বলেছেন— *"কাব্যস্যাত্মা ধ্বনিঃ"* অর্থাৎ ধ্বনি বা ব্যঙ্গ্যার্থই কাব্যের আত্মা।
* **২. অর্থের সীমাহীন বিস্তার:**
অভিধা ও লক্ষণার অর্থ নির্দিষ্ট এবং সীমাবদ্ধ। অভিধানে শব্দের বাচ্যার্থ বাঁধা থাকে। কিন্তু ব্যঞ্জনার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। পাঠকের মেধা, কল্পনাশক্তি এবং মানসিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে ব্যঙ্গ্যার্থের নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। একই কবিতা বা বাক্য ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন ব্যঞ্জনা তৈরি করতে পারে।
* **৩. চমৎকারিত্ব ও রহস্যময়তা:**
যা সরাসরি বলা হয়, তার মধ্যে কোনো রহস্য বা চমৎকারিত্ব থাকে না। অভিধা সবকিছুকে অনাবৃত করে দেয়। কিন্তু ব্যঞ্জনা সত্যকে আংশিক আবৃত রেখে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। যেমন কোনো রূপসী রমণী অবগুণ্ঠনের (ঘোমটা) আড়ালে থাকলে তার সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি ব্যঞ্জনার আড়ালে থাকা অর্থ কাব্যকে বহুগুণ সুন্দর করে তোলে।
* **৪. অভিধা ও লক্ষণার ওপর নির্ভরশীলতা এবং শ্রেষ্ঠত্ব:**
ব্যঞ্জনা শক্তি কাজ শুরুই করে অভিধা ও লক্ষণার কাজ শেষ হওয়ার পর। ব্যঞ্জনা এদের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে 'প্রয়োজনবতী লক্ষণা'-র ক্ষেত্রে যে ‘প্রয়োজন’-এর জন্য মুখ্যার্থ ত্যাগ করে লক্ষ্যার্থ গ্রহণ করা হয়, সেই প্রয়োজনটি কিন্তু লক্ষণা প্রকাশ করতে পারে না; তা প্রকাশিত হয় একমাত্র ব্যঞ্জনার মাধ্যমেই। সুতরাং, লক্ষণার সার্থকতাও ব্যঞ্জনার ওপর নির্ভরশীল।
* **৫. কবিপ্রতিভার পরম প্রকাশ:**
সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন কথাবার্তায় অভিধা বা লক্ষণা ব্যবহার করে। কিন্তু একজন কবি যখন সাধারণ শব্দকেই অসাধারণ করে তোলেন, তখন তিনি ব্যঞ্জনা শক্তির আশ্রয় নেন। শব্দের এই শক্তির মাধ্যমেই কবির মৌলিক প্রতিভাটুকু প্রকাশ পায়।
### উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, অভিধা হলো কাব্যের বাহ্যিক রূপ বা দেহ, লক্ষণা হলো তার অলংকরণ বা অঙ্গসংস্থান, আর ব্যঞ্জনা হলো তার প্রাণ বা চেতনা। অভিধা ও লক্ষণা যেখানে শেষ হয়, ব্যঞ্জনার অসীম রাজত্ব সেখান থেকেই শুরু হয়। এই কারণেই ভারতীয় সাহিত্যতত্ত্বে এবং পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যভাবনার আলোকে শব্দের ত্রিবিধ শক্তির মধ্যে ব্যঞ্জনা শক্তিকেই সর্বোচ্চ ও শ্রেষ্ঠ আসন দেওয়া হয়েছে।
Comments
Post a Comment